মঙ্গলবার ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

অধিগ্রহণের আগেই ফসলি জমিতে বহুতল ভবন, উঠছে প্রশ্ন

আপডেটঃ ১২:২৬ অপরাহ্ণ | আগস্ট ১৮, ২০২৬

নিউজ ডেস্কঃ

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উত্তর পাশে ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে শত শত বহুতল ভবন।স্থানীয়দের অভিযোগ, খনি সম্প্রসারণের জন্য চিহ্নিত এলাকায় এসব ভবন গুলো নির্মাণ করা হয়েছে।ভবন গুলোর মালিকানা, নির্মাণের অনুমোদন এবং ভবিষ্যতে অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি মৌজায় সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষিজমির মধ্যে তিন থেকে চারতলা পর্যন্ত বেশ কিছু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।অনেক ভবনই জনশূন্য।কয়েকটির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে।

অধিকাংশ স্থাপনায় পাকা সড়ক, ড্রেনেজ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নেই।জমির আইল ধরে এসব ভবনে যেতে হয়।হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক জানান, বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়া এলাকায় প্রায় ১৫০টি এবং চৌহাটি মৌজায় প্রায় ৫০টি মোট প্রায় ২০০টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টির মতো ভবনের হোল্ডিং রয়েছে।

প্রায় দুই বছর ধরে এ ধরনের নির্মাণ চলছে বলে জানান তিনি।তবে পার্বতীপুর উপজেলা ইমারত ভবন নকশা কমিটির সদস্য ও উপজেলা প্রকৌশলী মো. মানিক মিঞা বলেন, এসব এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতির জন্য এখন পর্যন্ত কেউ আবেদন করেননি।বর্তমানে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে বলেও জানান তিনি।মোট কতটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, তার পরিসংখ্যান তাঁর কাছে নেই।

হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাজেদুর রহমান বলেন, নিয়ম না মেনে নির্মিত ভবনগুলোর কোনো হোল্ডিং ট্যাক্স বা নিবন্ধন করা হয়নি।নতুন সরকারি জরিপের সময় এসব ভবনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবিষ্যতে জমি অধিগ্রহণের সময় বেশি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় অনেকে কৃষিজমিতে অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ করেছেন।

একই সঙ্গে কিছু খনি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি পাওয়া যায়নি।পার্বতীপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সার্ভের সময় খনির ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।অভিযোগ গুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।

খনির মহাব্যবস্থাপক (সারফেস অপারেশন) আবুল কালাম মুহাম্মদ বদরুল আলম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোনো ভবন বা গুদাম নির্মাণ করেননি।সম্প্রসারণ এলাকায় তাঁর স্ত্রীর নামে জায়গা ছিল এবং সেখানে তাঁর স্ত্রীর নামে একটি গুদাম রয়েছে বলে জানান তিনি।খনির ব্যবস্থাপক (সাবসিডেন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট) মুহাম্মদ আক্কাছ আলীর বিরুদ্ধে চৌহাটি এলাকায় দ্বিতল বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।

তবে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, সেখানে তাঁর কোনো বাড়ি বা জায়গা নেই।হামিদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও সম্প্রসারণ এলাকায় ভবন থাকার অভিযোগ উঠেছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলবেন বলে জানান।

বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) তথ্য অনুযায়ী, খনি সম্প্রসারণের জন্য খনির উত্তর পাশে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর।পরে ২০২৬ সালের ২০ মে পূর্ব-দক্ষিণ পাশে আরও ১ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে প্রায় ৩০১ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রসারণের জন্য জরিপ ও সার্ভের কাজ চলছে।ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে ছয়টি বোরহোল করে ভূ-তাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।পরবর্তী ফেইস ডেভেলপমেন্টের জন্য নকশা তৈরি করে জেলা প্রশাসনের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

পার্বতীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহমুদ হুসাইন রাজু বলেন, এসব বিষয়ে এলাকাবাসীর কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।তাঁর দাবি, ভবন গুলো নির্মাণে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হয়নি।ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকায় খাজনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, সম্প্রসারণ এলাকার বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটিতে অধিগ্রহণের আগে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।খনির কোনো কর্মকর্তা সেখানে ভবন নির্মাণ করেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খনি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কয়েক দফায় খনির প্রয়োজনে ৭৯২ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।স্থানীয়দের ভাষ্য, এর আগে খনি এলাকার ১৩টি গ্রাম থেকে কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা মিলিয়ে আরও ৬৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, আগের অধিগ্রহণে পাওয়া ক্ষতিপূরণ দিয়ে অন্য এলাকায় একই পরিমাণ জমি কেনা সম্ভব হয়নি।

বসতবাড়ি রক্ষা কমিটির সভাপতি নুর মোহাম্মাদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রকৃত ভূমির মালিকদের শনাক্ত করে তাঁদের সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা সূত্র জানায়, স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন, ২০১৭ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মৌজায় জমি বিক্রির গড় মূল্য বিবেচনায় নিয়ে অধিগ্রহণ করা জমি ও স্থাপনার মূল্য নির্ধারণ করা হবে।হামিদপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জাহেদুজ্জামান জানান, ইউনিয়নের ২৮টি মৌজায় ৯ হাজার ৫০২ একর কৃষিজমি রয়েছে।

কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলে কৃষিজমি কমছে।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজিব হুসাইন বলেন, কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে উর্বর জমি নষ্ট হচ্ছে।বিষয়টি উদ্বেগজনক।স্থানীয়দের দাবি, অধিগ্রহণের আগে নির্মিত ভবনগুলোর মালিকানা, নির্মাণ অনুমোদন, জমির শ্রেণি ও প্রকৃত মালিকানা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।

একই সঙ্গে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

IPCS News : Dhaka : আব্দুস সালাম, দিনাজপুর।