রবিবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

শ্রমিকসংকট আর চড়া সুদের চাপে বন্ধ দুই-তৃতীয়াংশ হাসকিং মিল, পথে বসেছেন মালিক-শ্রমিকেরা

আপডেটঃ ১:০৮ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

নিউজ ডেস্কঃ

দিনাজপুরের একসময়ের জমজমাট হাসকিং মিল বা ছোট চালকল শিল্প আজ গভীর সংকটে পড়েছে।শ্রমিকসংকট, পুঁজির অভাব, করপোরেট অটো রাইস মিলের প্রতিযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবর্তিত সরকারি নীতিমালার কারণে ঐতিহ্যবাহী এই শ্রমঘন শিল্পটি এখন বন্ধের উপক্রম।জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দিনাজপুরে ২ হাজার ১৮০টি হাসকিং মিল চালু থাকলেও ২০২৫ সালে তা কমে মাত্র ৭০৩টিতে নেমে এসেছে।অর্থাৎ, মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মিল বন্ধ হয়ে গেছে।শুধু হাসকিং মিল নয়, একই সময়ে অটো রাইস মিলের সংখ্যাও ৩৪৬টি থেকে কমে ২২৩টিতে দাঁড়িয়েছে।

অনেক মিলে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে; কোনো কোনো মিল গোদাম হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, আবার কেউ কেউ চাতাল পরিবর্তন করে ভুট্টা শুকানো বা গোখাদ্যের তুষ তৈরির কাজে ব্যবহার করছেন।২০১০ সালের পর থেকে দেশে অটো রাইস মিলের সংখ্যা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়।একটি অটো রাইস মিলের উৎপাদনক্ষমতা বহুসংখ্যক হাসকিং মিলের সমান।

স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব মিলে উৎপাদিত চকচকে চালের চাহিদা বাজারে বেশি।বিপরীতে, হাসকিং মিলের চাল কিছুটা খসখসে ও লালচে হওয়ায় ভোক্তাদের একটি বড় অংশের কাছে এর চাহিদা কমছে।বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও অটো রাইস মিলগুলোর এজেন্টরা কৃষকদের আগাম অর্থ দিয়ে ধান সংগ্রহ করায় হাসকিং মিলগুলো পর্যাপ্ত ধান কিনতে পারছে না।

পাশাপাশি, তীব্র শ্রমিকসংকটের কারণে ধান সেদ্ধ, শুকানো ও ভাঙানোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে।কাজ না থাকায় শ্রমিকরাও অন্য পেশায় (যেমন: অটোরিকশা চালানো) চলে যাচ্ছেন।ব্যবসায়ীদের মতে, একসময়ের সহজলভ্য কৃষিঋণ ও এর সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় (৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত) অনেক উদ্যোক্তা ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে মূলধন হারিয়েছেন এবং ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছেন।

চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন শর্ত ও মানদণ্ড (যেমন ভাঙা দানার হার এবং চালের বাহ্যিক চকচকে ভাব) সরাসরি পালনে ছোট মিল গুলো হিমশিম খায়।অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষার উপযুক্ত যন্ত্রপাতি না থাকায় এবং দৃশ্যমান চকচকে না থাকার কারণে সরকারি সংগ্রহ থেকে এসব মিল বাদ পড়ে যায়।

ভোক্তারা বর্তমানে অতিরিক্ত চকচকে চালের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।তবে পুষ্টিবিদদের মতে, হাসকিং মিলের লালচে চালে খনিজ ও পুষ্টি উপাদান বেশি থাকে এবং অতিরিক্ত চকচকে চাল দীর্ঘসময় খেলে পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে।নানা প্রতিকূলতার পরও কিছু হাসকিং মিলের মালিক এখনো ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।

তাদের উৎপাদিত চালের মান ও ভাত সহজে গলে যাওয়ার সুবাদে কিছু সচেতন ক্রেতা এখনো এসব চাল কিনছেন।সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু করপোরেট প্রতিযোগিতা বা মিলের আধিক্য নয়, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নীতিমালার সংস্কার, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

অন্যথায়, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত এই ঐতিহ্যবাহী খাতটি পুরোপুরি বিলীন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

IPCS News : Dhaka : আব্দুস সালাম, দিনাজপুর।