প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে দিনাজপুরের ঐতিহ্য
আপডেটঃ ২:৪২ অপরাহ্ণ | জুলাই ৩০, ২০২৬
নিউজ ডেস্কঃ
হাতপাখা, কুলা, ডালি, ঝুড়ি কিংবা মাছ ধরার ডার্কি একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বাঁশের তৈরি এসব সরঞ্জাম।অথচ আধুনিকতার ছোঁয়া আর সস্তার প্লাস্টিক পণ্যের সয়লাবে দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী সেই বাঁশ শিল্প আজ বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে।দিনাজপুরের বিভিন্ন হাটে ঘুরে দেখা গেছে, শ্রম আর সময়ের সঠিক মূল্য না পেয়ে চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই কুটির শিল্পের সাথে জড়িত কারিগররা।জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সেতাবগঞ্জ হাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশের তৈরি পণ্যের বেচাকেনা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
কাঁচামাল হিসেবে বাঁশের আকাশচুম্বী দাম আর বাজারজাতকরণের জটিলতায় উৎপাদন খরচই উঠছে না।ফলে জীবন ধারণের তাগিদে এই শিল্পের সাথে যুক্ত অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে পা বাড়াচ্ছেন দিনমজুরি কিংবা ইজিবাইক চালনার মতো বিকল্প আয়ের সন্ধানে।৪০ বছর ধরে এই কাজের সাথে জড়িত অভিজ্ঞ কারিগর বিপ্লব পাল আক্ষেপ করে বলেন, আগে বাঁশের কাজ করে সংসার খুব ভালো চলত।
এখন আর চলে না।ছেলে-মেয়েরাও এই কাজ শিখতে চায় না, সবাই অন্য কাজ খুঁজছে।একই কথা জানালেন ৩০ বছর ধরে এ পেশায় থাকা মহেশচন্দ্র রায় ও প্রবীণ কারিগর অনিল পাল।কেবল পূর্ব-পুরুষদের স্মৃতির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতেই তারা নামমাত্র লাভে এখনও এ কাজ আঁকড়ে ধরে আছেন।কারিগর নিখিল সরকার জানান, অভাবের কারণে বড় ছেলেকে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় পাঠাতে হয়েছে।
তবে এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছেন শফিকুল ইসলামের মতো কিছু দূরদর্শী কারিগর।আধুনিক যুগের রুচি অনুযায়ী বাঁশের তৈরি পণ্যে কিছুটা নতুন রূপ ও রঙের বৈচিত্র্য এনে সফলতা পাচ্ছেন তিনি।কারিগর শফিকুল ইসলাম বলেন, নতুন প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এখন রং-চং করে নতুন আঙ্গিকে পণ্য তৈরি করছি।
এতে বিক্রি ভালো হচ্ছে এবং ভালো লাভও পাচ্ছি।তরুণ উদ্যোক্তা আরিফ হোসেন মনে করেন, বাঁশ শিল্প শুধু কোনো অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ।শিল্পটি রক্ষা করতে হলে সঠিকভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ, আধুনিক ডিজাইন ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।
কারিগর ও স্থানীয় অভিজ্ঞদের মতে, বাঁশ শিল্পকে বাঁচিয়ে তুলতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন: যুগের চাহিদা অনুযায়ী নতুন ডিজাইনের মানসম্মত পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ।প্রান্তিক কারিগরদের আর্থিক সংকট মেটাতে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা।
পরিকল্পিতভাবে বাঁশের বাণিজ্যিক উৎপাদনে চাষীদের উৎসাহিত করা।সব শুনে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), দিনাজপুর-এর উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাহেদুল ইসলাম জানান, শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, কারিগরদের দক্ষতা বাড়াতে কমপক্ষে ৩ মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা রয়েছে।পাশাপাশি আগ্রহী কারিগরদের ঋণ সহায়তা ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এই শিল্পকে টেকসই করার আশ্বাস দেন তিনি।সরকারি কার্যকর পদক্ষেপ ও বিসিকের সঠিক নজরদারিই পারে দিনাজপুরের বিলুপ্তপ্রায় এই বাঁশ শিল্পকে নতুন প্রাণ দিতে।
অন্যথায়, খুব শীঘ্রই শত বছরের এই শিল্প হারিয়ে যাবে ইতিহাস ও স্মৃতির পাতায়।
IPCS News : Dhaka : আব্দুস সালাম : দিনাজপুর।

