সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি দিনাজপুরের পান চাষিরা
আপডেটঃ ১:৫৩ অপরাহ্ণ | নভেম্বর ১৭, ২০২৫
নিউজ ডেস্কঃ
দিনাজপুর:- উত্তরের শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরের কৃষিতে এবার প্রকৃতির আশীর্বাদ, কিন্তু বাজারের অভিশাপ ! ধানের জেলার খেতাবের পাশাপাশি একসময় পান উৎপাদনে সুখ্যাতি অর্জন করা দিনাজপুরে, বিশেষ করে হাকিমপুর উপজেলায়, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে পান পাতার বরজে এসেছে বাম্পার ফলন।কিন্তু এই ফলনই এখন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।বাজারে ন্যায্য দাম না পেয়ে ঐতিহ্যবাহী এই ফসল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন চাষিরা।সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে অধিকাংশ জায়গায় পান চাষ কমে গেলেও, হাকিমপুর উপজেলার খট্টামাধবপাড়া ইউনিয়নের মাধবপাড়া গ্রাম এখন সবুজে মোড়া পানের বরজে আচ্ছাদিত।কিন্তু এই সবুজ দৃশ্যপটের আড়ালে লুকিয়ে আছে চাষিদের চাপা কান্না।
চাষিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পানের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।গত বছর যে ১০০ পিস পান (৮০-৯০ পিসকে এক পোন বা বিড়া ধরা হয়) ৫০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ টাকায়।অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দাম কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।মাধবপাড়া গ্রামের পানচাষি আব্দুল্লাহ হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, সার, কীটনাশক, সেচ আর শ্রমিকের মজুরি, সবকিছুর দাম বেড়েছে।
অথচ এখন পান বিক্রি করে কোনো লাভ হচ্ছে না, উল্টো লোকসান দিতে হচ্ছে।২৫ টাকা দরে বিক্রি করলে খরচও উঠবে না।বিরামপুর, ফুলবাড়ী, ও খানসামা উপজেলার কৃষকরাও একই লোকসানের শিকার।খানসামা উপজেলার ২০ বছরের অভিজ্ঞ চাষি সুমন বলেন, পান রাখার জায়গা না থাকায় কম দামে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই।এমন ফলনেও দামের এমন অবস্থা আগে কখনো দেখিনি।
পানচাষিরা বলছেন, বাজারে পাইকার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট কাজ করছে।ফলন ভালো হওয়ার সুযোগে তারা ইচ্ছামতো দাম হাঁকছেন।ফুলবাড়ীর তরুণ পানচাষি ইদ্রিস অভিযোগ করেন, বাজারে পাইকাররা যা দাম বলে, আমাদের তাতেই বিক্রি করতে হয়।বিক্রি না হলে পান পচে যাবে। পরিশ্রম তো বৃথা যাচ্ছেই, সাথে পুঁজিও হারাতে হচ্ছে।
পাশের জেলাগুলোতেও পানের দাম কমার একই খবর পাওয়া গেছে।বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হাকিমপুর-সহ অন্যান্য স্থানে ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে পানের যোগান অতিরিক্ত বেড়ে গেছে।কিন্তু সেই তুলনায় চাহিদা বাড়েনি।এর সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। চাষিদের পাশাপাশি এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পান বরজের দিনমজুর শ্রমিকরা।
পান কম বিক্রি হওয়ায় এবং লোকসানের কারণে বরজে শ্রমিকের কাজ কমে গেছে।নারী পানচাষি ফাতেমা জানান, পানচাষে নারীরাও সমানভাবে পরিশ্রম করে।এখন লাভ তো দূরের কথা, ঘর চালানোই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আগে যারা নিয়মিত কাজ পেতেন, তাদের আয় এখন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।বেকার হয়ে পড়ছে হাজার হাজার পানচর্চাকারী ও কর্মচারী।
হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম স্বীকার করেছেন, চলতি মৌসুমে প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে ৫৪০ মেট্রিক টন পানের উৎপাদন হয়েছে।তিনি জানান, তারা নিয়মিত পরামর্শ দিলেও, দামের বিষয়টি বাজারের চাহিদা ও যোগানের ওপর নির্ভর করে।চাষিদের দাবি ঐতিহ্যবাহী এই ফসলের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন: সরকারের ন্যায্য মূল্য নীতি প্রণয়ন।
পাইকার সিন্ডিকেট ভাঙতে বাজারে কঠোর তদারকি।কৃষকদের সরাসরি বিক্রির জন্য বিকল্প বাজার তৈরির ব্যবস্থা।তাদের মতে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ না হলে, দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী পান চাষ অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং হাজার হাজার কৃষক পরিবার লোকসানের মুখে পথে বসবে।
IPCS News : Dhaka : আব্দুস সালাম : দিনাজপুর।

