মঙ্গলবার ৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২২শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

শিক্ষাবইয়ে নতুন অধ্যায়: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন তুলে ধরা হয়েছে

আপডেটঃ ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ | নভেম্বর ২৩, ২০২৫

নিউজ ডেস্কঃ

২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে স্বাধীন বাংলাদেশে গণ–অভ্যুত্থানের বিভিন্ন অধ্যায় নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান’ নামের নতুন অধ্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের চিত্র। একই সঙ্গে পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট ও ঘটনার ধারাবাহিকতা।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, শুধু একটি অধ্যায়ের পরিবর্তন নয়, বরং মাধ্যমিকের প্রায় সব শ্রেণির বইয়ে ছোট-বড় বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ নজর কেড়েছে অষ্টম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য কণিকা বই থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। পরিবর্তিত কনটেন্টগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ইতিহাস, শাসনব্যবস্থা, আন্দোলন ও গণতন্ত্রের বিকাশ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

পাঠ্যবইয়ের নতুন অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকার কর্তৃত্ববাদী রূপ নেয় এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শের মানুষের ওপর দমনপীড়ন বাড়তে থাকে। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংকট শুরু হয়। পরে ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে ভোট গ্রহণ এবং ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের ঘটনাগুলোকে ‘দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার রোডম্যাপ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অধ্যায়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুর্নীতির প্রসার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের পাচার চরম মাত্রায় পৌঁছায়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার একটি কমিশন গঠন করলে তাদের রিপোর্টে দেখা যায়, গত ষোলো বছরে বছরে প্রায় ষোলো বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে এটিকে একটি ‘চোরতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ফলাফল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এছাড়া ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণজাগরণ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাক্রমকে একই অধ্যায়ে সংযুক্ত করা হয়েছে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়। শেখ মুজিব সরকারের সময় বাকশাল প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এরপর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু হওয়া এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়টিও নতুনভাবে বর্ণিত হয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অংশে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হয়েছিল জুন ২০২৪-এ। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও পুলিশের গুলিতে কয়েকজনের প্রাণহানির পর আন্দোলন দেশব্যাপী রূপ নেয়। প্রচণ্ড জন–আক্রোশ ও রাজপথে লাখ মানুষের উপস্থিতিতে সরকার কঠোর বলপ্রয়োগ শুরু করলেও এর বিপরীতে প্রতিরোধ আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে, যা পাঠ্যবইয়ে ‘ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে গণজাগরণের বিজয়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, এ আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রাফিতি ও দেওয়ালচিত্রের বিপুল ব্যবহার, যেখানে ইনসাফ, মানবিক মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় সংহতির বার্তা উঠে আসে। পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে, এই গণ–আন্দোলনের ফলে জনগণের মধ্যে যে অধিকারসচেতনতা তৈরী হয়েছে, তা ভবিষ্যতের যে কোনো সরকারকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন মানতে বাধ্য করবে।

নতুন শিক্ষাবর্ষের এসব পরিবর্তন ইতোমধ্যেই শিক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এনসিটিবি জানিয়েছে, এসব পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসকে বাস্তবধর্মী ও তথ্যভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য করা হয়েছে। তবে পাঠ্যবই বিতরণ শুরু হলে এ নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

IPCS News : Dhaka :