আইনি লড়াইয়ে ফের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা: আপিল বিভাগে শুনানি শুরু
আপডেটঃ ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ | আগস্ট ২৬, ২০২৫
নিউজ ডেস্কঃ
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আজ মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট ২০২৫ দেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এক শুনানি শুরু হয়েছে। ২০১১ সালে দেওয়া এক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলোপ করা হয়েছিল। সেই রায়ের পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদনগুলো আজ থেকে শুনানি শুরু করলো আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে এই বেঞ্চ বসেছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী বেঞ্চে ছয় থেকে সাতজন বিচারপতি রয়েছেন।
এই মামলায় মোট পাঁচটি আবেদন করা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিক এবং আরও একজন আলাদাভাবে আবেদন করেছেন। বিএনপি ও জামায়াতের আবেদনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন আরও কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী। জামায়াতের পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, বিষয়টির গুরুত্বের কারণে এটি দ্রুত শুনানির জন্য মেনশন করা হয়েছিল এবং আপিল বিভাগ এটিকে ‘টপ আইটেম’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে আজকের দিনেই এটির শুনানি শুরু হয়। তিনি জানান, এ নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জানানো হয়েছে।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিরোধী দলের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ব্যবস্থায় নির্বাচনকালে একটি নির্দলীয় সরকার গঠিত হতো, যার প্রধান ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। এই ব্যবস্থা কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে প্রযোজ্য হয় এবং রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতার পরিবেশও সৃষ্টি করে। তবে ২০০৪ সালে হাইকোর্ট একে বৈধ ঘোষণা করলেও ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায়ে জানায়, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা অসাংবিধানিক। এর ফলে ওই বছরের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী, যা আনুষ্ঠানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করে। এরপর ৩ জুলাই গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয় এই সংশোধনী।
তবে বিতর্ক এখানেই থেমে থাকেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ শুরু থেকেই দাবি জানিয়ে আসছিল যে, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাদের মতে, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনই হতে পারে জনগণের আস্থা অর্জনের একমাত্র পথ। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত ওই বেঞ্চ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত ২০ ও ২১ ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করেন। এই ধারাগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।
বর্তমানে যে রিভিউ শুনানি শুরু হয়েছে, তা রাজনৈতিকভাবে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। কারণ, যদি আপিল বিভাগ পূর্বের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে নতুন কোনো ব্যাখ্যা বা রায় প্রদান করে, তবে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি বরাবরই দাবি করে আসছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন কখনোই নিরপেক্ষ হবে না। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। অন্যদিকে সরকারপক্ষ বরাবরই বলে আসছে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানবিরোধী এবং জনগণের নির্বাচিত সরকারকেই নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে আজকের শুনানি শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আদালতের এ সিদ্ধান্তের দিকে সারা দেশের রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ জনগণ গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। আজকের শুনানিতে বিভিন্ন পক্ষের আইনজীবীরা তাদের যুক্তি উপস্থাপন করছেন। এর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে কেন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয় এবং কেন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা জরুরি। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার রায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ধারা, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। যদি আদালত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে পুনর্বহাল করে, তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে একটি ভিন্নধর্মী চিত্র দেখা যেতে পারে। আর যদি আগের রায় বহাল থাকে, তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন আরও জোরদার হতে পারে।
IPCS News : Dhaka :

