বুধবার ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

পাকিস্তানে সেনাপ্রধানকে আজীবন দায়মুক্তি ও বিস্তৃত ক্ষমতা: স্বৈরতন্ত্রের আশঙ্কা বাড়ছে

আপডেটঃ ১২:০৮ অপরাহ্ণ | নভেম্বর ১৫, ২০২৫

নিউজ ডেস্কঃ

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে নতুন ও বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি গ্রেফতার ও বিচার থেকে আজীবন দায়মুক্তি প্রদান করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সংবিধানের ২৭তম সংশোধনী আইন হিসেবে কার্যকর হওয়ায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও বিচারিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সমালোচকদের মতে, এ পদক্ষেপ পাকিস্তানকে আরও সুস্পষ্টভাবে এক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সংশোধনীর ফলে সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী আসিম মুনির এখন নৌ ও বিমান বাহিনীরও তত্ত্বাবধান করবেন। ফিল্ড মার্শাল পদটি আজীবনের জন্য বহাল থাকবে এবং অবসর পরবর্তী সময়েও রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে তাকে ‘দায়িত্ব ও কাজ’ প্রদান করা যাবে। এর অর্থ, তিনি দীর্ঘ সময় জনপরিসরে একটি শক্তিশালী অবস্থানে থাকবেন।সমর্থকদের যুক্তি, এতে সামরিক কমান্ড কাঠামো আরও সুস্পষ্ট হবে এবং প্রশাসনিক সুবিধা বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের উদ্ধৃতি দিয়ে সরকারি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধের প্রয়োজন বিবেচনায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্যই এই পরিবর্তন।কিন্তু সমালোচকরা মনে করছেন, এটি সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বৈধতা দেওয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, দেশটি এখন আর ‘হাইব্রিড শাসন’ নয়, বরং ‘পোস্ট-হাইব্রিড’ পর্যায়ে যেখানে বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি ভারসাম্যহীন।

সাংবাদিক মুনিজা জাহাঙ্গীর মনে করেন, এমন সময়ে সেনাবাহিনীকে আরও ক্ষমতায়ন করা হলো যখন তাদের ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। তার মতে, “সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক শাসনের মধ্যে কোনো ভারসাম্যই আর অবশিষ্ট নেই।”সংশোধনীর আরেক বড় প্রভাব পড়েছে বিচার বিভাগে। নতুন একটি ‘ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত’ গঠনের মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রশ্ন নিষ্পত্তির ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্ট থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। আদালতের প্রধান বিচারপতি ও বিচারকদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। সমালোচকরা বলছেন, বিচার ব্যবস্থায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব এখন আরও স্পষ্ট এবং এতে ন্যায়বিচারের স্বাধীনতা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ দিনের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আতহার মিনাল্লাহ এবং মনসুর আলী শাহ পদত্যাগ করেন। তারা পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন—সংবিধানের যে কাঠামো রক্ষার শপথ তারা নিয়েছিলেন, সেটি আর বজায় নেই; সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টকে ভেঙে দিয়েছে এবং বিচার বিভাগকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে ঠেলে দিয়েছে।নতুন নিয়মে বিচারকদের সম্মতি ছাড়াই বদলি করা যাবে এবং বদলিতে অস্বীকৃতি জানালে অবসরের ঝুঁকি থাকবে। অনেকেই এটিকে সরকার-বান্ধব রায় আদায়ের চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংকুচিত করবে এবং পাকিস্তানে ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে পড়বে। সুপ্রিম কোর্টের করাচিভিত্তিক আইনজীবী সালাহউদ্দিন আহমেদের মন্তব্য অনুযায়ী, মামলার জট কমানোর দাবি এখানে “অযৌক্তিক যুক্তি”, কারণ অধিকাংশ বিচারাধীন মামলা সুপ্রিম কোর্টে নেই।বিশ্লেষকরা মনে করেন, ধারাবাহিক সংশোধনীর মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা আরও কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং এর ফলাফল সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ভালো সংকেত নয়।আরিফা নূর বলেন, দেশটি “স্পষ্টভাবে কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে” এবং ২৭তম সংশোধনীর পর এখন ২৮তম সংশোধনীর জল্পনাও চলছে।

পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর প্রভাব বরাবরই প্রবল ছিল, তবে এই সংশোধনী সেই প্রভাবকে সাংবিধানিক রূপ দিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যকে নাটকীয়ভাবে সামরিক বাহিনীর পক্ষে সরিয়ে দিল এমনটাই মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক।

IPCS News : Dhaka :