শনিবার ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

রাজশাহীতে বিলম্বে ওঠা আমের বাগান, আছে দেশি বিদেশি ১৭ প্রজাতির আমগাছ

আপডেটঃ ৩:৫৪ অপরাহ্ণ | জুন ২২, ২০২১

নিউজ ডেস্কঃ জমিটা চাষিদের বর্গা দেয়া হতো।মালিক মশিউর রহমান কমল দেখলেন,অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে নষ্ট হচ্ছে জমির উর্বরতা।তাই সিদ্ধান্ত নিলেন জমিতে চাষাবাদই বন্ধ করে দেবেন।করবেন আমের বাগান।যেই ভাবনা সেই কাজ।কমল তাঁর আট বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন আমবাগান।বাজারে যখন আম প্রায় শেষ হবে তখন কমলের বাগান থেকে কেবল আম ওঠা শুরু হয়।কমলের আমবাগান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ধামিলামাঠে।আর বাগান থেকে কমলের বাড়ি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে।গ্রামের নাম দামকুড়া।কমলের আটবিঘা আয়তনের বাগানে আছে দেশী-বিদেশী ১৭ জাতের আম।গাছের সংখ্যা ১হাজার ১০০টি।ছোট ছোট গাছের ডাল এখন নুইয়ে পড়ছে আমে।রাস্তা থেকেই মানুষের দৃষ্টি কাড়ছে কমলের বাগানের মেরুন রংয়ের এক আম।স্থানীয়রা ভাবছেন এটি ‘সিন্দুরী’ জাতের আম।প্রকৃতপক্ষে এটি বারি-৭ জাতের আম।

কিছুটা লম্বাটে আকারের আরেকটি আম নজর কাড়ছে মানুষের।অনেকটা কলার মত দেখতে বলে এই আমের নাম ‘ব্যানানা’।আছে বড় বড় আকারের বারি-৪।এসব আম পাকে দেরীতে।এতে বেশ ভাল দামও পাওয়া যায়।উন্নতজাতের গোপালভোগ, হিমসাগর কিংবা লক্ষণভোগের পর রাজশাহীতে বেশি পাওয়া যায় আম্রপালি।গোপালভোগ, হিমসাগর, লক্ষণভোগ ওঠে কিছুটা আগেই।এসব আম কমলের বাগানে নেই।তবে কিছুটা দেরিতে ওঠা আম্রপালি আছে তাঁর বাগানে।এছাড়া হাড়িভাঙ্গা, চোষা, নাকফজলি, কারাবাউ, রেড, পাহুতান, কেরালা জাতের আম আছে এই বাগানে।বিদেশী ব্রুনাই কিং এবং সিঙ্গাপুরের একটি জাতের আমগাছও আছে।ব্রুনাই কিং জাতের একটি আমের ওজন হয়ে থাকে সাড়ে চার থেকে পাঁচ কেজি পর্যন্ত।বারি-৪ আমের ওজন হয়ে থাকে ৫০০ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত।২১জুন সোমবার বিকালে কমলের আমবাগানে গিয়ে দেখা গেছে, আমের ভারে ছোট ছোট গাছগুলোর ডাল নুইয়ে পড়ছে। গাছে গাছে প্রচুর ধরেছে বড় বড় আকারের বারি-৪ আম।আর মেরুন রংয়ের বারি-৭ জাতের আম যেন বাগানের সৌন্দর্যটাই বদলে দিয়েছে।

বাগানমালিক কমল জানালেন, বাগানটি তিনি ইজারা দিয়েছেন।রাজশাহী নগরীর ওবায়দুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বাগানটি ইজারা নিয়েছেন।রাজশাহী কলেজ থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেছেন কমল।তারপর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছিলেন।চাকরি ছেড়ে মন দিয়েছেন কৃষিতে।শুরুর গল্পটাও শোনালেন কমল।বললেন, চাকরি ছেড়ে প্রথমে চাষাবাদ শুরু করেন।তখন তাঁকে সব কাজই করতে হতো কৃষিশ্রমিকের ওপর নির্ভর করে।কিছু জমি বর্গাও দিয়েছিলেন।তখন দেখেন, বর্গা চাষিরা অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করে জমির উর্বরতা নষ্ট করছেন।তাই চিন্তা করেন জমিতে বাগান করবেন।এরপর ২০১৪ সালে বাগানটি গড়ে তোলেন।বাগানে সব দেরীতে ওঠা আম প্রসঙ্গে কমল জানালেন, এটা তিনি পরিকল্পিতভাবেই করেছেন।কমলের ভাষায়, ‘আমাদের এখানে সব আম একসঙ্গে পেকে যায়।একসঙ্গে সব আম পাকে বলে বাড়ির নারীদের ভাল আম খাওয়ার সুযোগ হয় না।যেটা আগে পঁচে, সেটাই আগে খান।এই করতে করতে সব পঁচা আমই খেতে হয়।তাই চিন্তা করলাম, এমন আমের বাগান করব যেটা পাকবেই পরে।এ রকম ১৭টি জাতের গাছ লাগিয়েছি।চারাগুলো সব নওগাঁর একটা নার্সারি থেকে নেয়া হয়েছিল।আমরা মধুমাস বলতে জ্যেষ্ঠ মাসকে বুঝি।

আর ৯০ ভাগ ফলই ওঠে এই জ্যেষ্ঠ-আষাঢ় মাসে।আমি এই মাস দুটো বাদ দিয়ে আম তুলতে চাই।আমার চিন্তাটা সফল হয়েছে।আমার আম সব দেরীতেই পাকে।তখন ভাল দামও পাওয়া যায়।আমের মৌসুমের শুরুতে কিছুটা দাম পাওয়া যায়।কিন্তু মাঝামাঝি সময়ে দাম কমে যায়।আবার শেষে দাম বাড়ে।আমি শেষের দামটাই নিতে চেয়েছি।তখন তো জাতভেদে আমের দাম চার থেকে আট হাজার টাকা মণ হয়।বলছিলেন কমল।কমল জানালেন, ২০১৪ সালে বাগান করার পরের বছরই গাছে মুকুল এসেছে।তখন গাছ খুব ছোট ছিল বলে বেশিরভাগ গাছের মুকুল ছিঁড়ে ফেলেন।২০১৬ সালেও মুকুল ভেঙে দিয়ে আম নেন কম করে।সেই আম আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বিলি করেন।২০১৭ সালে নিজেই আম পেড়ে বিক্রি করেন।এরপর থেকে বাগান ইজারা দিয়ে আসছেন।ইতোমধ্যে তাঁর বিনিয়োগের অর্থ উঠে এসেছে।শুধু তাই নয়, আট বিঘা জমি বর্গা দিলে যে টাকা পাওয়া যেত সেটিও উঠে আসছে বাগান থেকে।কমল জানান, বাগানে পরিকল্পিতভাবেই গাছ লাগানো আছে।বারি-৭ জাতের রঙিন আমের বোঁটা শক্ত।তাই বাগানের উত্তরদিকে এসব গাছ লাগানো হয়েছে।এতে অন্য গাছগুলো রক্ষা পায়।বাগানের গাছ যত বড় হবে তত ভেতরের জায়গা ফাঁকা করতে হবে। এ জন্য বাগানের ভেতরেই সারি সারি গাছ কেটে ফেলতে হবে।তাহলে বাকি গাছগুলো ভাল থাকবে।দীর্ঘদিন টিকবে।ভাল আমও ধরবে।

IPCS News রাজশাহী প্রতিনিধি: