মঙ্গলবার ১৮ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

রাজশাহীর সরমংলা খাল শুকিয়ে কাঠ বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো চাষিদের মাথায় হাত

আপডেটঃ ১২:৪৭ অপরাহ্ণ | এপ্রিল ১০, ২০২১

নিউজ ডেস্কঃ

বরেন্দ্রের আশীর্বাদ হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর সরমংলা খালের বেশিরভাগ অংশই শুকিয়ে গেছে।চলতি বোরো মৌসুমে সেচের পানি না পেয়ে বরেন্দ্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষকরা অসহায় হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা।গোদাগাড়ী উপজেলায় প্রায় ২৯ কিলোমিটার লম্বা খালটি মূলত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থায়নে ১২ কোটি ১৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প।প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)।প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল পদ্মা নদী থেকে পানি তুলে খালের মাধ্যমে সারা বছরব্যাপী বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের ব্যবস্থা করা।সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি তাদের ‘সবচেয়ে সফল কাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিএমডিএ।

তবে সরকারি কর্মকর্তা ও কৃষকরা জানিয়েছেন, সরমংলা খালে বোরো চাষের পানি পাওয়া যাচ্ছে না।খালে পানি না পেয়ে কৃষকরা ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন কিংবা ফসলি জমিগুলো পতিত রেখে দিচ্ছেন।ফলে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ‘ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস করে পরিবেশ বাঁচানো’ ভেস্তে যাচ্ছে।কৃষকদের অভিযোগ, ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে সেচের জন্য খালের দুপাশে অনেকেই গভীর নলকূপসহ নানা ধরনের সেচযন্ত্র স্থাপন করেছেন।এসব সেচযন্ত্রের বেশিরভাগের মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, যারা বিএমডিএ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কৃষকদের কাছে সেচের পানি বিক্রির জন্য খালে পানি সরবরাহ না করার ব্যবস্থা করেন।এ কারণেই সরমংলা খালে পানি থাকে না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।

তবে, বিএমডিএ কর্মকর্তারা কৃষকদের এ অভিযোগ অস্বীকার করে বিএমডিএ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শামসুল হুদা” দৈনিক সমাচার “কে বলেন, ‘অভিযোগটি সত্য নয়।খালে সবসময় পানি থাকা উচিত, তবে কখনো কখনো কৃষকরা সব পানি উত্তোলন করে ফেলেন।আমরা প্রয়োজনমত পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলন করে খালটি আবার পূর্ণ করি।’কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও কৃষকরা জানিয়েছেন, খালটিতে বর্ষা মৌসুমের দু-তিন মাস ছাড়া সারাবছরই পানির অভাব থাকে এবং গত ১০ বছর ধরে তারা একই অবস্থা দেখছেন।

বিএমডিএ’র মতে, গোদাগাড়ি উপজেলার নিত্যানন্দপুর থেকে বিলপাটিকুলা পর্যন্ত প্রসারিত সরমংলা খালটি তৈরি করা হয়েছিল দুদিকে অন্তত দুই হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য।তবে, গোদাগাড়ি ডিএই’র এক হিসাবে খালের পানিতে সেচের এলাকা দেড়শ হেক্টরের বেশি হবে না।যা বিএমডিএ’র লক্ষ্যমাত্রার মাত্র সাত দশমিক পাঁচ শতাংশ।মাঠ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে উপজেলা ডিএই কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম” দৈনিক সমাচার” কে জানান, খালের নিত্যানন্দপুর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার অংশে সবসময় পানি থাকে।

তবে গোগ্রাম থেকে বাকি ১৯ কিলোমিটার অংশে শুকনো মৌসুমে কখনো পানি থাকে না।তিনি আরো জানান,ইউএনডিপি টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির অধীনে ২০০৩ সালে খালটি পুনরায় খনন, খালে পানি ধরে রাখার জন্য বাঁধ নির্মাণ এবং পদ্মা নদীতে পাম্প স্থাপন ও নদীর পানি খালে প্রবাহের জন্য তিন দশমিক পাঁচ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের জন্য অর্থায়ন করে।বিএমডিএ ২০০৬-০৭ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করে এবং সেচের পানি বিতরণের জন্য খালে ৩৩টি লো-লিফট পাম্প এবং ছয়টি সোলার প্যানেল স্থাপন করে।কৃষক আন্দোলন ও অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে খাবার পানি সংকট দেখা দিলে সরকারি আদেশে বিএমডিএ ২০১২ সালে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের নতুন প্রকল্প গ্রহণ বন্ধ করে দেয়।সেসময় থেকেই সরকার বিএমডিএকে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচের পন্থা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়ে আসছে।

বিএমডিএ কর্মকর্তারা জানান, সরমংলা খাল প্রকল্পের শুরুর দিকে দুটি পাম্পের মাধ্যমে পদ্মা নদী থেকে দৈনিক ৩০ কিউসেক পানি তোলা যেত। তবে পাম্প ও পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে এখন এই সক্ষমতা ১৫ কিউসেকে নেমে গেছে।‘তারপরও খালটি পূর্ণ রাখতে এই সক্ষমতাই যথেষ্ট’, বলেন বিএমডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসান।খালের অনেক অংশ শুকিয়ে গেছে। সম্প্রতি বিএমডিএ কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হলে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন।তবে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শামসুল হুদা বলেন, ‘কৃষকরা হয়তো সব পানি তুলে নিয়ে সেচের কাজে লাগিয়েছেন।’অন্যদিকে কৃষকরা জানান, তারা সবচেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করেন বোরো চাষে।কিন্তু বোরো চাষ শুরু করার জন্য খালে তারা কোনো পানি পাননি।চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে জগপুর গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায় খালটি শুষ্ক অবস্থায় রয়েছে।শুধু বিএমডিএ’র সৌর প্যানেলের কাছে অল্প পানি রয়েছে।গত বুধবারেও এই গ্রামের কৃষকরা ফোনে জানান, খালটি এখন পুরোপুরি শুষ্ক।কৃষকরা আরও জানান, মহলাপুর, সাপাইপুর, তুলসীপুর, মুরালিপুর, গোগ্রাম, ধাতমা, বোশিপাড়া, বেলোড়া, বিরোইল ও বিলপাটিকুলা অঞ্চলে খালে পানি নেই।

জগপুরের কৃষক তাজিরুল ইসলাম জানান, তিনি একটি বেসরকারি গভীর নলকূপের সেচযন্ত্র থেকে পানি নিয়ে শূন্য দশমিক ৫৬ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করছেন।‘ভূগর্ভস্থ পানিতে খরচ বেশি, তবুও খালে পানি না পেয়ে আমাকে পানি কিনতে হচ্ছে’, বলেন তিনি।এই গ্রামে খালের ১০০ মিটারের মধ্যে অন্তত দুটি ব্যক্তিগত গভীর নলকূপ দেখা গেছে।এর একটির মালিক নাক্রাদিঘি এলাকার আনোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, ‘আমি ১০ বছর আগে গভীর নলকূপটি বসিয়েছি। কৃষকরা শুকনো মৌসুমে পানির জন্য কান্নাকাটি করে দেখে বসিয়েছি।’তার সেচ মেশিনটি নয় দশমিক ৬৩ হেক্টর জমি এবং কখনো কখনো আরও বেশি অঞ্চল জুড়ে সেচ দিতে সক্ষম বলে জানান তিনি।

জগপুরের আরেক কৃষক মাজেদ আলী বলেন, ‘খালটি প্রতি শুকনো মৌসুমেই শুকিয়ে থাকে।এটি পুনরায় খনন করার পর থেকে আমি কখনো চৈত্রের ধানের (বোরো) আবাদ করতে পারিনি।’তিনি আরো জানান, তার এক দশমিক ছয় হেক্টর জমি পানির অভাবে বোরো মৌসুমের তিন মাস পর্যন্ত পতিত থাকবে।মো. রাজু নামের অপর কৃষক বলেন, ‘এই মুহূর্তে যদি পানি পেতাম, তাহলে আমি চৈত্রের ধান (বোরো) এবং অন্যান্য ফসলের আবাদ করতে পারতাম।’

জগপুর গ্রামে বিএমডিএ’র সোলার প্যানেল পরিচালনা করেন এবং ৮০ হেক্টরের বেশি জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য লো-লিফট পাম্প চালান আতাউর রহমান।তিনি জানান, বর্ষাকালের মাসগুলো বাদে তাকে অলস বসে থাকতে হয়।‘খালে পানি না থাকলে আমার কোনো কাজ নেই’, বলেও জানান তিনি।শ্রীরামপুর এলাকার কৃষকরা জানান, সেখানে চার দশমিক ৪২ হেক্টর জমির মধ্যে বোরো ধানের চাষ হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯৬ হেক্টর জমিতে। বাকি জমি পতিত পড়ে আছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বোরো ধান চাষকৃত জমির অংশ সবুজ এবং মাঠের অন্য বিস্তীর্ণ অংশে ধুসর গমের খড় পড়ে ছিল। কৃষকরা সেখানে গবাদি পশু ও ছাগল চরাচ্ছিলেন।কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, ‘যখন পানি পাওয়া যায়, তখন আমরা গম তোলার পরে বোরো চাষ করি।তবে এই মৌসুমে পানির অভাবে এই জমিগুলো বর্ষা পর্যন্ত তিন মাস পতিত থাকবে।’তিনি জানান, কিছু কৃষক নিজস্ব ধানের প্রয়োজনে বোরো চাষ করেছেন খাবার পানি তোলা পাম্পের পানি ব্যবহার করে।‘আমি বাড়তি ব্যয় এড়াতে এই পাম্পগুলো ব্যবহার করি না’, বলেন তিনি।বিএমডিএ সেচযন্ত্রের চেয়ে এসব ব্যক্তিগত পানির পাম্প ব্যবহারে খরচ বেশি। কারণ এসব ছোট মেশিনে পানি তুলতে বেশি সময় লাগে বলে জানান তিনি।

একই গ্রামের শাহিন আলী শূন্য দশমিক শূন্য দুই হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন।তিনি জমি সেচ দেওয়ার জন্য বাড়ির খাবার পানি তোলার পাম্প ব্যবহার করেন।তাকে অন্য কৃষকের বোরো জমিতেও পানি সরবরাহ করতে দেখা গেছে।‘আমি কী করব? কৃষকরা তাদের বোরো ধান বাঁচানোর জন্য কান্নাকাটি করে। আমি তাদের জমিতে পানি সরবরাহ করা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখি না’, বলেন শাহিন আলী।তিনি জানান, গত জানুয়ারিতে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস থেকে নোটিশ দিয়ে বলা হয়েছিল যে, তার সংযোগটি অবৈধ।কিছু টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগের লোড বাড়িয়ে নেওয়ার পর তারা আর কিছু বলে না।

‘বরেন্দ্রের মাটির নিচের পানি কিছু মানুষের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের তেল খনির মতো হয়ে উঠেছে। যে কেউ একটি সেচ পাম্প বসিয়ে দিতে পারলেই কয়েক বছরের মধ্যে ধনী হয়ে যাচ্ছে।আমরা তো এটা নিজের চোখেই দেখছি’, বলেন কৃষক মাজেদ আলী।তিনি আরও বলেন, ‘বেশিরভাগ পাম্প মালিক প্রতি ঘণ্টা বিদ্যুতের জন্য ২৮ টাকা ব্যয় করেন এবং কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি ঘণ্টা ১১০ টাকা করে আদায় করেন। লাভ হয় ৮২ টাকা করে। কৃষকদের শূন্য দশমিক ১৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের জন্য বেসরকারি নলকূপ অপারেটরদের অন্তত চার হাজার টাকা দিতে হয়।’

পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরমংলা খালে প্রবাহিত করা হয়।চলতি মৌসুমে পদ্মা নদীতে ‘পর্যাপ্ত’ পানি প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাদুল ইসলাম।তিনি বলেন, ‘গঙ্গা পানি চুক্তি অনুসারে ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত প্রতি ১০ দিন অন্তর ভারত ও বাংলাদেশ এই নদীতে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পেয়ে থাকে।

IPCS News/রির্পোট, আবুল কালাম আজাদ।