শনিবার ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

৩ মাসেই ৫০০ কোটি টাকার টমেটো বিক্রয় করেছে রাজশাহীর টমেটো চাষিরা

আপডেটঃ ১২:১৯ অপরাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ০২, ২০২১

নিউজ ডেস্কঃ

রাজশাহী বিভাগের সবচেয়ে বেশি টমেটো উৎপাদন হয় রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে।মাত্র তিন মাসে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫০০ কোটি টাকার মতো টমেটোর ব্যবসা হয়।টমেটো উৎপাদনকে কেন্দ্র করে এই সময়ে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থানও হয়।টমেটো উৎপাদন লাভজনক হওয়ায় তাই প্রতিবছর টমেটো চাষ বাড়ছে।এছাড়া আগাম টমেটো উৎপাদনে রাজশাহীর টমেটো দেশের মধ্যে শীর্ষে হওয়ায় প্রতিবছর ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে পাইকাররা এসে সরাসরি কৃষকদের জমি থেকে টমেটো কিনেন।তারপর প্রসেসিং করে দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্রির জন্য পাঠান।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহীতে গত সাত বছরে মোট ১৫ হাজার ৯৮৮ হেক্টর জমিতে টমেটোর চাষ হয়েছে।

মোট টমেটো উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৫৬ মেট্রিক টন।গত সাতবছরের তুলনায় এবছর রাজশাহীতে টমেটোর আবাদ বেশি হয়েছে।এবছর রাজশাহীতে মোট ৩৬৬০ হেক্টর জমিতে টমেটোর চাষ হয়েছে।উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৬ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন।গতবছর ২৯২৫ হেক্টর জমিতে ৬৬,৩৬২ মেট্রিক টন টমেটো উৎপাদন হয়েছে।ঢাকার খামারবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী বিভাগে রাজশাহীর পরেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টমেটো উৎপাদন হয়।গতবছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৭১৫ হেক্টর জমিতে ৩৩,৯৪০ মেট্রিক টন টমেটো উৎপাদন হয়েছিলো।এবছর ২০১০ হেক্টর জমিতে টমেটোর চাষাবাদ হয়েছে।উৎপাদন লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন।

রাজশাহীতে ৭৬ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫০ হাজার ২৫০ মেট্রিক উৎপাদন ধরলে মোট উৎপাদন হচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন।গড়ে ৪০ টাকা কেজি হিসেবে টমেটোর দাম ধরলে মোট দাম দাঁড়াচ্ছে ৫০৬ কোটি টাকা।রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শামসুল হক জানান, শীতকালীন সবজি হিসেবে আগাম টমেটো চাষের জন্য রাজশাহীর টমেটো দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে।আগাম বলে এই অঞ্চলের চাষীরা দামও ভালো পায়।শুরুতে তো এক কেজি টমটো বিক্রি হয় কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়।পরে শেষে দিকে টমেটোর দাম কমে ২০ থেকে ২৫ টাকায় টমেটো বিক্রি হয়।সেখানে টমেটোর গড়দাম ৪০ টাকা কেজি ধরে হিসাব করা যায়।সেহিসেবে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫০০ কোটি টাকার বেশি টমেটোর ব্যবসা হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জেও টমেটো চাষ করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।অল্প জমিতে চাষাবাদ বেশি লাভের জন্য টমেটো চাষের বিকল্প নাই।রাজশাহীর পবা উপজেলার চর খোলাবনা গ্রামের কৃষক আব্দুস সোবহান মন্ডল মাচা পদ্ধতিতে ৫ বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছেন।তিনি বলেন, কোনো ধরনের বীষ প্রয়োগ ছাড়াই টমেটো চাষ করছি।পাইকারি হাটে নিয়ে গিয়ে টমেটো বিক্রি করছি।অন্যরা কীটনাশক ও বিষ প্রয়োগ করে বলে তাদের টমেটোর দাম কম।গতকাল সোমবার রাজশাহীর খড়খড়ি বাইপাস হাটে ১৮ মণ টমেটো বিক্রি করেছি ১০০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা মণ হিসেবে।আমার টমেটো গাছ পাকা ও বড় হওয়াতে দাম ভালো পাচ্ছি।তবে মাচা পদ্ধতিতে টমেটো চাষে খরচ বেশি পড়ে।বিঘাতে ৬০ হাজার টাকা খরচ পড়ে যায়।

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আকারভেদে ৩০ টাকা থেকে ৬০ টাকা কেজি পর্যন্ত খুচরা বাজারে টমেটো বিক্রি হচ্ছে।চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর এলাকার বড় পুকুরিয়া গ্রামের কৃষক দিদারুল আলম সেলিম ৬ বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছেন।তিনি গত তিন মাস ধরে বাজারে টমেটো বিক্রি করছেন।এখন বাজারে ৩০ টাকা কেজি দরে টমেটো বিক্রি করছেন তিনি।তিনি জানান, গাছ পাকা ভালো টমেটোর এখনো চাহিদা আছে।আমি জমিতে পাইকারি টমেটো বিক্রি করি ২০ টাকা কেজি হিসেবে।আর বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করলে ৩০ টাকা কেজি হিসেবে পাওয়া যায়।গাছ পাকা টমেটো হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমার টমেটোর সুনাম আছে বলে জানান তিনি।গোদাগাড়ীর সরমংলা গ্রামের কৃষক তৌহিদুল ইসলাম দুই বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছিলেন।তিনি জানান, এবছর টমেটো চাষের পর ব্যাকটেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ও আবহাওয়া খারাপের কারণে অনেক কৃষকেরই টমেটোর উৎপাদন কম হয়েছে। যাদের উৎপাদন কম হয়েছে তাদের উৎপাদন খরচ উঠানো কঠিন হয়ে পড়বে।এইজন্য তাদের লোকসান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।শুরুতে টমেটোর দাম বেশি থাকলেও এখন দাম কমে গেছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ৯০ সাল থেকে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে প্রচুর টমেটোর উৎপাদন শুরু হয়।টমেোটার চাষাবাদের তিন মাস এবং বাজারজাতকরণের দুই মাসে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।ফলে টমেটো উৎপাদন ও বিপণনের সাথে প্রচুর মানুষকে জড়িত থাকতে হয়।প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হয়।তাই টমেটোকেন্দ্রিক অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে তোলা উচিত।তবে যেসব অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি আছে তারাও ভালো দাম দিয়ে টমেটো ক্রয় করে নিতে পারে।অথচ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিগুলো যখন টমেটোর সবচেয়ে দাম কম তখন টমেটো কেনে।

প্রাণ এগ্রো বিজনেস লিমিটেডের টমেটো ক্রয় : ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্নস্থানে টমেটো বিক্রির পাশাপাশি প্রাণ এগ্রো বিজনেস লিমিটেডও রাজশাহীর টমেটো ক্রয় করে।এ মৌসুমে ১৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার থেকে তারা টমেটো ক্রয় শুরু করেছে।প্রাণ এগ্রো বিজনেস লিমিটেডের রাজশাহীর ডিজিএম এস এম সারোয়ার হোসেন জানান, গতবছর রাজশাহী থেকে আমরা ৩০ হাজার মেট্রিক টন পাকা টমেটো ক্রয় করেছিলাম।এবছর তার চেয়ে বেশি টমেটো ক্রয় করার লক্ষ্যমাত্রা আছে।এখন প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন সরবরাহকারী কৃষকদের কাছ থেকে ৪০০ মেট্রিক টন পাকা টমেটো কেনা হচ্ছে।দুই মাস ধরে টমেটো কেনা চলবে।টমেটো দিয়ে সস ও কেচাপ তৈরি করা হয় বলে জানান তিনি।

এ বি হামিদ বাবু নামের রাজশাহীর গোদাগাড়ীর একজন টমেটো সরবরাহকারী জানান, আমার তিনদিনের একটা চুক্তি আছে প্রাণ এগ্রোর সাথে।তাদের প্রতিদিন ৬ মেট্রিক টন টমেটো সরবরাহ করছিতারা দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রতিকেজি সাড়ে ৬ টাকা।আমি কৃষকদের কাছে কেজিপ্রতি তার চেয়ে কিছু কম টাকায় টমেটো ক্রয় করি।আমার নিজেরও তো লাভ করতে হবে।তিনদিন পর যদি দাম দর মেলে আবার নতুন চুক্তি শুরু হবে।গোদাগাড়ীর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছরের আগের বছরও সেজান পাকা টমেটো কিনতো।এখন শুধু প্রাণ এগ্রোকেই টমেটো কিনতে দেখা যায়।গবেষক আলতাফ পারভেজ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে মিসরে রোদে শুকানো টমেটোর ছবি দিয়ে লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের একটা বিদেশী কাগজে এই ছবিগুলো প্রকাশিত হয়েছে।মিসরে বাড়তি টমাটো রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সূর্যের আলোতে শুকানো টমাটোর বেশ চাহিদাও আছে।মিসরের চাষীরা এখন সেই সুযোগ নিচ্ছে।দেশটিতে একসময় বিপুল টমাটো অপচয় হতো।

তিনি আরো লিখেছেন, আমাদের দেশেও প্রতি শীত মওসুমের শেষের দিকে অনেক সবজি উৎপাদকই ভালো দাম পান না।গত মাসেই ঢাকার কাছের সাভারে ক্ষেতে ও রাস্তার ধারে অনেক সবজি পড়ে থাকতে দেখেছি।কৃষকরা সেখানে সেসব বাজারে নিতেও ইচ্ছুক নয়।মিসরে সূর্যের আলোতে স্বল্প খরচে টমাটো শুকানো এবং সেগুলো মোড়কজাত করার প্রযুক্তি বাংলাদেশের অনেক চাষীর জন্যই একটা ভালো বিকল্প হতে পারে।এটা ব্যাপকতা পেলে, অনেক জেলাতেই গ্রামে নারী-পুরুষ সকলের কর্মসংস্থানের একটা ভালো উপায় হতো।

IPCS News/রির্পোট, আবুল কালাম আজাদ।