রবিবার ১৭ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ১লা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ ভাবে অপরিকল্পিত পুকুর খনন

আপডেটঃ ৭:৪৯ অপরাহ্ণ | জানুয়ারি ০৭, ২০২১

নিউজ ডেস্কঃ

রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিগত বছরের ন্যায় আবারও শুরু হয়েছে অপরিকল্পিত পুকুর খনন।তবে পুকুর খনন সিন্ডিকেটের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে ম্যানেজের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে এই খনন কাজ। জানা গেছে, বিলের পানি শুকানোর সাথে সাথে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আবারও শুরু হয়েছে অপরিকল্পিত পুকুরখনন।মোহনপুর, বাগমারা, দুর্গাপুর, গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলায় পুকুরখনন এখন প্রকাশ্যেই চলছে।আর পবা উপজেলায় চুপিসারে হলেও খনন অব্যাহত রয়েছে।পবা উপজেলার বড়গাছি গ্রামে, পারিলার বালানগরে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে চলছে পুকুরখনন।গতকাল সোমবার এই উপজেলার বসন্তপুর গ্রাম সংলগ্ন বড়বিলে আবাদি জমি রক্ষায় পুকুর খনন না করার জন্য উপজেলা প্রশাসন বরাবরে আবেদন করেছেন এলাকাবাসী।এছাড়াও বড়গাছির জনৈক সুলতানের চাল মিলের পাশে খনন হচ্ছে পুরাতন পুকুর। সংস্কারের নামে আরও ৭-৮ বিঘা বাগান কেটে ভিটা জমিতে হচ্ছে পুকুরখনন। পবা থানা পুলিশ কয়েকদিন আগে খননযন্ত্রের ব্যাটারি জব্দ করে।

কিন্তু আবারও রাত-দিন কাটা হচ্ছে সেই পুকুর।রাজশাহী জেলায় বাণিজ্যিকভাবে মাছের খামার বেড়েছে প্রায় ৩ গুণ।মাছের উৎপাদন বাড়ায় একে সাফল্য হিসেবে দেখছে মৎস্য দপ্তর।এই সাফল্যই সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে কৃষি ক্ষেত্রে।শুধুমাত্র অপরিকল্পিত পুকুরখননের জন্যই জেলার বিভিন্ন ফসলের মাঠে দেখা দিয়েছে জমির প্রকৃতি পরিবর্তন, কৃষিজমিতে দীর্ঘ মেয়াদি জলাবদ্ধতা, পুকুরখননে মাটি বহনে গ্রামীণ রাস্তা নষ্ট, ফসল উৎপাদন ব্যাহত, বিলের পানি বেরুনোর নালা (খাল, ড্রেনেজ) বন্ধ হয়ে জনবসতিতে জলাবদ্ধতা।এর ফলে কৃষিজীবীদের মধ্যে বেকারত্ব, কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ায় যুব সমাজে মাদকাসক্তি এবং সর্বোপরি নগরীতে ভাসমান শ্রমিক বাড়ছে।অপরিকল্পিত পুকুর খননের ফলে এসব নেতিবাচক প্রভাব দেখেও অজানা কারণে নিশ্চুপ আছে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ।সচেতনমহল, পরিবেশবাদি ও ভুক্তভোগিরা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবেই দোষারোপ করে আসছে তাদের।

জেলার কৃষি দপ্তর বলছে, বাণিজ্যিকভাবে এসব পুকুর খনন হয়েছে আবাদি জমিতেই।ফলে কৃষি জমি কমছে।অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খননে জলাবদ্ধতায় প্রতি বছরই ব্যাপক ফসলহানি হচ্ছে।এর পরিমাণ প্রতিবছরই অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে।পরিবেশের ওপর বাড়ছে চাপ।এছাড়াও ফসল রোপনের আগেই ডুবে যাচ্ছে এলাকা।জনদুর্ভোগ বাড়ছে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে জেলায় মোট জমির পরিমাণ ২ লাখ ৪২ হাজার ৯৩১ হেক্টর।এক শতাংশও আবাদযোগ্য জমি পতিত নেই।২০০৭-২০০৮ সালেও জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৯১ হাজার ৭৮০ হেক্টর।২০১২-২০১৩ মেয়াদে তা কমে গিয়ে দাঁড়ায় এক লাখ ৯০ হাজার ৮১০ হেক্টরে।এখন আবাদযোগ্য জমি রয়েছে এক লাখ ৮৮ হাজার ৭৫৮ হেক্টর। এক দশকে আবাদযোগ্য জমি কমেছে ৩ হাজার হেক্টরের ওপরে।এর একটি বড় অংশ চলে গেছে বাণিজ্যিক পুকুর খননে।পরের বছরগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ।জ্যামিতিক হারে কমছে জেলার কৃষি জমি। সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞদের মতে সঠিক হিসাব করলে প্রায় পুকুর ঘেরের জন্য কৃষি জমি নষ্টে ১০ হাজার হেক্টর ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রেণি পরিবর্তন করে আবাদযোগ্য জমিতে পুকুর খননের সুযোগ নেই।তারপরও এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি নানান কৌশলে পুকুর খনন করে যাচ্ছে।বিশেষ করে বিল ও নিচু এলাকাগুলোতে অনাবাদি কিংবা এক ফসলি দেখিয়ে পুকুর খনন করছেন।মুনাফালোভীরা সেই সুযোগটিই নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, মৎস্যখামারিরা সাধারণত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জমি বছর মেয়াদি লিজ নিচ্ছেন কাউকে জমি বিক্রি করতে বাধ্যও করছেন।তাছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে চাষাবাদ না হওয়ায় চাষিরাও জমি লিজ অথবা বিক্রি করছেন।পুকুর খনন করে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা রাখছেন না খামারিরা।ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতায় ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ।কৃষকরা বলছেন, ফসলি জমি কেটে আসলে পুকুর হচ্ছে না, বরং মাছের ঘের হচ্ছে।মাত্র চার থেকে পাঁচ ফুট খনন করা হচ্ছে।কিন্তু পুকুর করতে হলে অন্তত ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীর করে খনন করতে হয়।কিন্তু খামারে খনন হচ্ছে মাত্র ৫-৮ ফুট।

শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পুকুর খনন চলছে জেলার নয় উপজেলাতেই।বর্তমানে জেলার কৃষি জমি এখন অলিখিতভাবে পুকুরখননকারিদের দখলে।রাষ্ট্রযন্ত্রের জেলা উপজেলার কর্তা ব্যক্তিরা নীরব ভূমিকা পালন করছেন।এতে পুকুর খননকারিরা উৎসাহিত হচ্ছে’।তিনি আরও বলেন, ‘ভূক্তভোগীরা বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে নির্যাতনের ঝুকির মধ্যে থাকছে।আবার কোন ঘের মালিক হাই কোর্টে রিট করে পুকুরখনন করছে।এতে অনেকগুলো ঝুকি থাকলেও প্রশাসন উদ্যোগ নিচ্ছেন না।পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মদদে পুকুরখননের হিড়িক চলছে’।

স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিরা যদি মনে করেন নিজ নিজ এলাকায় এই অপরিকল্পিত পুকুরখনন করতে দিবেন না, তবে কখনোই পুকুরখনন নয়।রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে প্রশাসনের পক্ষে বারবার অভিযান করেও পুকুরখননরোধ সম্ভব নয়।পুকুর খনন শুরু হয়েছে জেলার পবা, মোহনপুর, গোদাগাড়ী, বাগমারা ও দুর্গাপুরে।আবারও কৃষি জমি নষ্টের অপতৎপরতা চলছে।ক্ষুদ্র চাষিরা অনেক সময় প্রভাবশালীদের ভয়ে, সাময়িক বেশি লাভের আশায় এবং শ্রম থেকে রেহাই পেতে পুকুর খনন করতে দিচ্ছে।

কিন্তু প্রশাসন এই অপরিকল্পিত পুকুর খননরোধে বরাবরই জেগে জেগে ঘুমাচ্ছেন যা এ অঞ্চলে ভবিষ্যতে কৃষিতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।রাজশাহী নগরীর উপকণ্ঠ পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সাইফুল বারী ভুলু জানান, কয়েক বছরে তার ইউনিয়নের অর্ধেক আবাদি জমি পুকুরে চলে গেছে।যেটুকু জমি অবশিষ্ট ছিল নতুনভাবে তাতেও চলতে শুরু করেছে খননযন্ত্র।

অপরিকল্পিত পুকুর খননে জলাবদ্ধতা হয়ে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করছে।বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সামশুল হক বলেন, অধিকাংশ পুকুর খনন করা হয়েছে নিষ্কাশন নালা, এমনকি ব্রিজ-কালভার্টের মুখে।এতে হালকা বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।শুধু ফসল নষ্টই নয়, পুকুর খনন বেশি হওয়ায় গ্রামে গৃহপালিত প্রাণিও কমে যাচ্ছে।চারণভূমি সংকটে মানুষ গরু, মহিষ ও ছাগল প্রতিপালনে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

IPCS News /রির্পোট, আবুল কালাম আজাদ।