মঙ্গলবার ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

তালা, ঝাণ্ডা ও বাঁশি কিনে হরিলুট করে ২০২০ সালে আলোচিত রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল

আপডেটঃ ৬:৪২ অপরাহ্ণ | জানুয়ারি ০২, ২০২১

নিউজ ডেস্কঃ

২০২০ সালে পরিবহন অডিটের এক প্রতিবেদনে উঠে আশে পশিমাঞ্চল রেলওয়ের কেনাকাটার দুর্নীতির তথ্য।পাকশীর বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা ডিসিওর চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন স্টেশনে লেভেলক্রসিং গেটে ব্যবহারের জন্য তালা, বালতি, ঝাণ্ডা ও বাঁশি কেনা হয়েছে।এইসব মালামাল উচ্চমূল্যে ক্রয় করে সরকারের ২৬ লক্ষ ৭৩ হাজার ৮৫০ টাকার আর্থিক ক্ষতি করেছে রেলওয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তারা।এমনকি এই দুর্নীতির সাথে জড়িত রয়েছে, এই ক্রয় সংক্রান্ত বাজার যাচাই কমিটি, এস্টিমেট/প্রাক্কলন প্রণয়নকারী, এস্টিমেট অনুমোদনকারী, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি ও টেন্ডার মূল্যায়নের সুপারিশ অনুমোদনকারী এবং তাঁদের আস্তাভাজন ঠিকাদার।

অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় এই চক্রটি রেলওয়ে ঘুনটি ঘরে ব্যবহারের জন্য ১৬৫ টাকা দামের তালা পাঁচ হাজার ৫৯০ টাকায়,৩৯০ টাকার প্রতিটি বালতি এক হাজার ৮৯০ টাকায়,৬৫ টাকার প্রতি হুইসেল বাঁশি ৪১৫ টাকায় এবং ২০৭ টাকার হাত ঝাণ্ডা এক হাজার ৪৪০ টাকায় কিনেছেন।এ ক্রয়ের মধ্যে শুধু তালা বাজার মূল্যের ৩৩ গুন উচ্চমূল্যে ক্রয় করে সরকার তথা জনগণের রাজস্বের ১৮ লক্ষ ১৮ হাজার ৯০০ টাকা মেরে দিয়েছে চক্রটি।এমন তথ্য বেরিয়ে আসার পর প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকায় এ এস এম শাহনেওয়াজকে পূর্বাঞ্চলের চীফ অপারেটিং সুপারেনটেনডেন্ট এর দায়িত্ব থেকে ও এসডি করা হয়।কিন্তু নিরিক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখিত আছে মালামালের বাজার যাচাই, এস্টিমেট/প্রাক্কলন প্রণয়নকারী, টেন্ডার আহব্বান ও পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করাসহ সকল কার্যক্রম সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক সিওএস বেলাল হোসেন সরকার এর দপ্তরে হয়।তবে এখনও পযন্ত এই সিওএস ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে নিজের চেয়ারে বহাল তবিয়তে থাকলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এছাড়া পশ্চিমাঞ্চলের রেলে অস্বাভাবিক দরে মালামাল ক্রয় করলেও বাজার যাচাই কমিটি, এস্টিমেট/প্রাক্কলন প্রণয়নকারী ও পণ্যের মূল্য নির্ধারণকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখনও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এই কেনাকাটার অনিয়ম দুর্নীতি ও সরকারের রাজস্বের টাকা আত্বসাৎ এর ঘটনা তদন্তে কমিটি প্রায় ৩ মাস কাজ শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ এই সিওএস বেলাল হোসেন সরকার ও তার ক্যাশিয়ার উচ্চমান সহকারী নুরুল আমিন তালুকদার, সাবেক সহকারী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (এসিওএস) মো. জাহিদ কাওছারের বিরুদ্ধে বরখাস্ত, বিভাগীয় ও ফৌজদারী মামলার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। রেলের সূত্রগুলো বলছে, এতদিন ঘুষের বিনিময় লবিং করে বহাল তবিয়তে থাকলেও অল্প সময়ে দুর্নীতির বরপুত্র সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল হোসেন সরকার বরখাস্ত হচ্ছে।ব্রেন্ডের নামে, লোকাল নিম্ন মানের মাল ক্রয়।সেগুলো সরবরাহ হয়নি।এদিকে চলতি বছরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মালপত্র কেনাকাটার নিরীক্ষা করতে গিয়ে অভিনব সব দুর্নীতির দেখা পায় পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা (অডিট) কমিটি।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেলওয়ে মালপত্র কিনলেও তার অনেক কিছুই নিরীক্ষার সময় পাওয়া যায়নি।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অধীন নাটোর স্টেশনে ২৫টি পর্দা মজুদে কম দেখা গেছে।এতে ক্ষতি হয়েছে তিন লাখ ৬৪ হাজার ৭৫০ টাকার।

২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর পাকশী রেলওয়ের অধীন নাটোর স্টেশনের জন্য ৫০টি উন্নত মানের ভিআইপি পর্দা কেনা হয়।প্রতিটি পর্দার দাম ১৪ হাজার ৫৯১ টাকা হিসাবে দাম পরিশোধ করা হয়, কিন্তু ৫০টির বদলে সরবরাহ করা হয় ২৫টি পর্দা।একই অর্থবছরে খুলনা রি-মডেলিং স্টেশনের জন্য কেনা পর্দার মধ্যে ৯৪টি মজুদে কম পাওয়া যায়।এতে রেলওয়ের ক্ষতি হয়েছে ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৮২১ টাকার। খুলনা রি-মডেলিং স্টেশনের বিভিন্ন কক্ষে ব্যবহারের জন্য ২৪৬টি উন্নত মানের ভিআইপি পর্দা কেনা হয়েছিল।২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর স্টেশন মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার পর্দাগুলো বুঝে নেন এবং মজুদ রেজিস্টারে এন্ট্রি করেন। নিরীক্ষা কর্মকর্তারা এ বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে খুলনা রি-মডেলিং স্টেশনে গিয়ে যাচাই করে ১৫২টি পর্দা পান।বাকি ৯৪টি পর্দা পাওয়া যায়নি।খুলনা রি-মডেলিং স্টেশনে সাত লাখ ৯৮ হাজার ৫৯২ টাকা দরের ১৬টি স্টিল আলমারি অরিজিন ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সরবরাহ না করায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।খুলনা রি-মডেলিং স্টেশনের জন্য ‘অটবি’ বা ‘হাতিল’ ব্র্যান্ডের ১৬টি স্টিল আলমারি কেনার কথা, যার প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৪৯ হাজার ৯১২ টাকা।অথচ স্থানীয় বাজার থেকে নন-ব্র্যান্ডের ১৬টি স্টিল আলমারি কেনা হয়েছে।এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে সাত লাখ ৯৮ হাজার ৫৯২ টাকার।

বিনা প্রয়োজনে পরামর্শক নিয়োগ করেও রেলের ক্ষতি করা হয়েছ ১৫ কোটির অধিক টাকাঈশ্বরদী থেকে ঢালার চর পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিনা প্রয়োজনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসিই কনসালট্যান্ট লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে ১৫ কোটি ১৬ লাখ ৩২ হাজার টাকার ক্ষতি কর হয়েছে বলে ওই নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে উল্লিখিত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, যা পুরোটাই অপ্রয়োজনীয়।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেলওয়ের নিজস্ব সুদক্ষ লোকবল এবং সুনির্দিষ্ট ও সঠিক নির্দেশনা থাকার পরও পরামর্শক নিয়োগ অপ্রয়োজনীয় বলেও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।এ ছাড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও তাদের কাজ যথাযথভাবে করেনি।কনসালটেন্সি ফি হিসেবে দেওয়া পুরো ১৫ কোটি ১৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ১১টি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে কেনা মালপত্র সরবরাহ না করে দুই কোটি ৫৬ লাখ ২৪ হাজার ১৪৮ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ২২০টি লাগেজ ট্রলি কেনার জন্য গত বছরের ১৭ জুন ২২০টি ‘প্রেসিডেন্ট ব্র্যান্ডের লাগেজ ট্রলি (ইন্ডিয়া) সরবরাহ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে।তবে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে অডিট চলার সময় ওই ট্রলির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

IPCS News /রির্পোট, আবুল কালাম আজাদ।