শনিবার ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

রাজশাহীতে বছরে ৮০ কোটি টাকার হলুদের ব্যবসা

আপডেটঃ ৪:৫৯ অপরাহ্ণ | ডিসেম্বর ০৮, ২০২০

নিউজ ডেস্কঃ

রাজশাহীতে বছরে ৮০ কোটি টাকাধিক মশলাজাতীয় শস্য, হলুদের ব্যবসা হয়।আর এই হলুদ চাষের সাথে জড়িত রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কৃষক।রাজশাহীতে উৎপাদিত হলুদ ঢাকাসহ সারাদেশে যায়।তবে, ভারত থেকে হলুদ আমদানির ফকে লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা।রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, রাজশাহীতে সব উপজেলায় কমবেশি হলুদ চাষ হলেও জেলার মধ্যে পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি হলুদ চাষ হয়।গতবছর রাজশাহী জেলায় এক হাজার ৮৩৯ হেক্টর জমিতে হলুদের চাষাবাদ হয়েছিলো।সেখান থেকে শুকনা হলুদ পাওয়া গেছে ৬ হাজার ৫৫১ মেট্রিক টন।এবছর দুই হাজার ৩৪ মেট্রিক টন জমিতে হলুদের চাষ হয়েছে।আগামী দুই মাস পর কৃষকরা হলুদ ঘরে তুলতে পারবেন।গত ১০ বছরের চাষাবাদের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, এই জেলায় গড়ে প্রতিবছর ৬ থেকে ৭ হাজার মেট্রিক টন শুকনা হলুদ উৎপাদন হয়েছে।প্রতিকেজি শুকনা হলুদের দাম গড়ে ১২০ টাকা ধরা হলে এক মেট্রিক টন হলুদের দাম দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।সে হিসেবে ৬ হাজার ৫৫১ মেট্রিক টন হলুদের দাম দাঁড়ায় ৭৯ কোটি ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকা।তবে বাজারে শুকনা হলুদ ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরেও বিক্রি হয়।

হলুদ চাষিরা জানান, হলুদের বীজ জমিতে বপনের পর পাঁচ থেকে ছয় মাস পর  হলুদ পরিপক্ক হয়। তখন বিঘাপ্রতি  হলুদের ফলন হয় ৭০ থেকে ৮০ মণ।এরপর সেই কাঁচা হলুদ গরম পানিতে সেদ্ধ করে জমিতে শুকাতে হয়। ২০ থেকে ২৫ দিন শুকানোর পর শুকনো হলুদ পাওয়া যায়।যা বিক্রি করা হয়।শুকনা হলুদ কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০টাকা কেজি দরে বিক্রি হলে কাঁচা হলুদ বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে। চার থেকে পাঁচ মণ কাঁচা হলুদ শুকানোর পর এক মণ শুকনা হলুদ পাওয়া যায়।কৃষকরা জানান, আগে মাঠভর্তি হলুদ চাষ করতেন কৃষকরা।তখন উৎপাদনও ভালো হতো, দামও বেশি পাওয়া যেত। তবে এখন বেশিরভাগ চাষীরা হলুদ চাষ করেন আম বাগানে সাথী ফসল হিসেবে।আম বাগানে চাষ করায় হলুদের উৎপাদনও কমে গেছে।আগে যেখানে বিঘাপ্রতি ১০০ মণ পর্যন্ত কাঁচা হলুদ পাওয়া যেত এখন সেখানে ৭০ থেকে ৮০ মণ হলুদ পাওয়া যায়।

বেশিরভাগ কৃষকরা সাথী ফসল হিসেবে উঁচু ভিটা জমি ও পতিত জমিতে এবং বাড়ির আঙিনায়ও হলুদ চাষ করে থাকেন।চারঘাটের কৃষক মহিবুল ইসলাম জানান, ১০ বছর আগে পাঁচ বিঘা জমিতে হলুদ চাষ করতাম। এখন সেখানে দুই বিঘা জমিতে হলুদ চাষ করছে।তা-ও আম বাগানে সাথী ফসল হিসেবে চাষ করছি।বেশিরভাগ কৃষকরা এখনই সাথী ফসল হিসেবে হলুদ চাষ করেন।কেউ ১০ কাঠা জমিতে, কেউ ১৫ কাঠা জমিতে-এভাবে খন্ড খন্ড জমিতে হলুদ চাষ করেন।সাথী ফসল হিসেবে চাষাবাদ করায় হলুদের উৎপাদনও কমে গেছে।একই উপজেলার কৃষক ভাদু মন্ডল জানান, এবছর হলুদে বেশি পচা রোগ দেখা দিয়েছে।গাছের পাতা মরে যাচ্ছে।গাছের পাতা মরে গেলে হলুদের উৎপাদন কমে যায়।কীটনাশক ওষুধ দিয়ে পচা মরা রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। এক বিঘা জমিতে হলুদ চাষ করতে ১০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়।প্রথম কয়েকদফা জমি চাষাবাদ করে সার দিয়ে জমি প্রস্তুত করার পর বীজ বপন করতে হয়। হলুদ গাছ বড় হয়ে গেলে তখন শুধু কীটনাশক দিলেই চলে।

বাঘা উপজেলার আড়ানী গ্রামের কৃষক মোখলেসুর রহমান জানান, আগে আড়ানী এলাকার কৃষকরা হলুদ চাষাবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।এক সময় এই গ্রামের সকল এমন পরিবার হলুদ চাষ করতেন ।এখন বেশিরভাগ কৃষকই হলুদের চাষ কমিয়ে দিয়েছেন।সেখানে এখন আম বাগান করেছেন। মাঠ ভর্তি সবজি চাষাবাদ করছেন।কারণ সেসব বিক্রি করে তাৎক্ষণিকভাবে বেশি লাভ হওয়া যাচ্ছে। এবছর আমি ৪ কাঠা জমিতে বেগুন বিক্রি করেছি ৬১ হাজার টাকার।যা হলুদ চাষের চেয়ে লাভজনক। তারপরও আমার ১৫ কাঠা জমিতে হলুদ রয়েছে।রাজশাহীর মধ্যে আড়ানী বাজারে সপ্তাহে দুইদিন বৃহত হলুদের হাট বসে।সেখানে প্রতি হাটে  এক হাজার মণের অধিক হলুদ বেচাকেনা হয়।এই হাটি ১০ থেকে ১৫ জন আড়তদার রয়েছে।মোল্লা ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক নূর মোহাম্মদ মোল্লা জানান, তারা প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ হাজার মণ শুকনা হলুদ বিভিন্ন কৃষকদের কাছ থেকে কিনেন।তারপর সেই হলুদ তাদের কারখানাতে বাছাই করেন।বাছাইয়ের জন্য ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক প্রতিদিন তাদের কারখানায় কাজ করেন।বাছাই শেষে আকৃতিভেদে প্যাকেটজাত করে তারা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন।আবার সরাসরি হলুদের গুঁড়া তৈরির কোম্পানির কাছেও তারা তাদের হলুদ বিক্রি করেন।

৪৫ বছর ধরে হলুদের ব্যবসার সাথে জড়িত আড়ানী বাজারের একরামুল হক সনৎ।তিনি বলেন, ভারত ও বার্মা থেকে হলুদ আমদানীর কারণে আমাদের দেশের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা মার খাচ্ছেন।সরকার প্রায় ৬০ ভাগ হলুদ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানী করছে।ফলে কৃষক নিজেদের হলুদ উৎপাদন করে তাদের উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না।অথচ অন্য দেশের তুলনায় আমাদের হলুদের কোয়ালিট খুবই ভালো। আগের মতো হলুদ ব্যবসা আর লাভজনক না।বহুবছর ধরে হলুদের ব্যবসা করায় আর এই পেশার মায়া ছাড়তে পারিনি।রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শামসুল হক জানান, আগের চেয়ে আবাদের পরিমাণ কমলেও হেক্টর প্রতি হলুদের উৎপাদন বেড়েছে।কৃষকরাও হলুদ চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।

আগে যেখানে কৃষকরা হলুদ লাগিয়ে ফেলে রাখতেন, এখন সেখানে সার, সেচ ও কীটনাশক দেওয়ায় হলুদের উৎপাদন বেশি হচ্ছে।এছাড়া হাইব্রিড, বারি ও উফসী জাতের কিছু হলুদের উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।আমরাও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে হলুদ চাষে কৃষকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।এখন চেষ্টা করা হচ্ছে, স্থানীয় জাত বাদ দিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ উদ্ভাবিত বেশি ফলনের হলুদ যাতে চাষীরা চাষাবাদ করেন সেই বিষয়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

IPCS News /রির্পোট, আবুল কালাম আজাদ।