বুধবার ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

রঙ্গিন আলোক রশ্মির কারনে, রাজশাহীতে দৃষ্টি সমস্যায় ৮০ শতাংশ মানুষ

আপডেটঃ ৭:৫৩ অপরাহ্ণ | নভেম্বর ০৮, ২০২০

নিউজ ডেস্কঃ

রাজশাহীতে ৮০ শতাংশ মানুষ চোখের সমস্যায় ভুগছেন।কারন হিসাবে রামেক হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের বিশষজ্ঞরা বলছেন, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষ এখন বেশি সময় ধরে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইলেক্ট্রনিক্ যন্ত্র ব্যবহারে অধিক সময় দিচ্ছেন।এর ফলে চোখে রঙ্গিন আলোক রশ্মির প্রতিফলনের ফলে চোখের ওপর অধিকা হারে চাপ পড়ায় মানুষের চোখের সমস্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।রামেক হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. ইউসুফ আলী জানান, রাজশাহীতে জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ দৃষ্টি সমস্যায় ভুগছেন।কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, শিশু-কিশোর ও যুবকদের অধিক সময় আকাশ সংস্কৃতি বা ইন্টারনেট ফেসবুক ব্যবহার।পাশাপাশি জন্মের পর বিভিন্ন রোগ যেমন- চোখে পর্দা পড়া, ছানিপড়া, চোখ ট্যারা এবং অ্যালার্জির কারণে অনেক মানুষ ক্ষীণ দৃষ্টিতে ভোগেন। চোখের রোগি বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জন্মগতভাবে সমস্যা, ফরমালিনযুক্ত খাবার, বদ্ধ পরিবেশে বসবাস।বর্তমানে মারাত্মক সমস্যায় আছেন যারা অধিক সময় ইন্টারনেটে মোবাইল কম্পিউটারে বেশি সময় দিচ্ছে।

এসময় চোখের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে! দিনে দিনে এই সমস্যা বিপদ ডেকে আনছে।রাজশাহীর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা-এই হারে চোখের সমস্যা বাড়তে থাকলে শিগগিরই বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।তাই এখনি সচেতনতা সৃষ্টিতে তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, যারা অফিসে বেশি সময় কম্পিউটারে কাজ করেন তাদের ৪০ মিনিট বা এক ঘণ্টা পর পর চোখ ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।পাঁচ থেকে দশ মিনিট চেয়ারে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিতে হবে।প্রয়োজনের বেশি মনিটরে চোখ রাখা যাবে না।সমস্যা বেশি হলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে।হাসপাতালের ভর্তিরত রোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শহরের অধিকাংশ সময় বাসাবাড়ি বা অফিসের বদ্ধ পরিবেশে দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করার ফলে চোখের নানা জটিলতায় চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে।আর গ্রামের রোগীরা ছানি ও চোখের ছোট ছোট সমস্যার বিষয়গুলো গুরুত্ব না দেয়ায় নানান সমস্যার শিকার হচ্ছেন।পাশাপাশি শহরে অপরিশোধিত পানি খাওয়ার ফলে চোখের নানা রোগে ভুগছে মানুষ।

তাই শহরের মাঝে পুকুর ও নদীর পানি ফুটিয়ে পরিস্কার পানি ব্যবহার করা ও নিয়মিত ওয়াসার পাইপ লাইন গুলো পরিস্কার রাখতে হবে।আর এই মুহূর্তে রঙিন শাকসবজি ও ছোট মাছ খাওয়া এবং সময়মত চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে চলার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।রামেক হাসপাতালে চক্ষু বিভাগের আউটডোর ও ইনডোরে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সংখ্যাও বেড়েছে।প্রতিদিন আউডোরে দুইশতাধিক ও ইনডোরে ৫০ থেকে ৬০ জন রোগি চিকিৎসা নিচ্ছেন।এছাড়াও ১৫ টি উপজেলাতে কমিউনিটি ভিশন সেন্টারে অনলাইনে ২০০ জনকে সেবা দেয়া হচ্ছে।প্রতিদিন অপারেশন হচ্ছে ১৫ জনের।প্রতি মাসে অপারেশন হচ্ছে ২৫০ জনের।অপারেশনের ৮০ ভাগ চোখের ছানি সমস্যা নিয়ে ভুগছেন।চিকিৎসা নিতে আসা রোগিদের বেশির ভাগই নারী।পুরুষের চেয়ে নারীদের সংখ্যা অনেক বেশি।মাসে ১৬০ থেকে ২০০ জন রোগি ভর্তিরত অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।তাদের আটদিনের মাথায় ছাড়পত্র দিয়ে দেয়া হচ্ছে।হাসপাতালে চক্ষু বিভাগে সেবা দেয়ার সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায়।

প্রতিদিন ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের ৬৪টি বেড ও ইনডোর-আউটডোরের দুইশতাধিক রোগি। সপ্তাহে চারদিন ১৫ টি উপজেলাতে কমিউনিটি ভিসন সেন্টারে অনলাইনে ২০০ জনকে সেবা দিচ্ছে মাত্র ১১ জন চিকিৎসক।একজন বিভাগীয় প্রধান, সহকারী অধ্যাপক ৫ জন, রেজিস্ট্রার ৪ জন ও আইএমও একজন।কিন্তু চিকিৎসকের সংখ্যা ২০ জনের বেশি হলে সেবার মান আরো বাড়ানো সম্ভব বলে জানান কর্মরত চিকিৎসকরা।রোগিদের সেবা দিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সকল প্রকার ওষুধ রয়েছে অপ্রতুল।এই সমস্যাগুলো সমাধান করলে আধুনিক মানের সেবা পাবে রোগিরা।বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগি সাবিনা ইয়াসমিন জানান, দীর্ঘ দিন থেকে চোখে কম দেখছি। এর আগেও বাইরে সেবা নিয়েছি ভালো হচ্ছে না।তাই আজ সেবা নিতে হাসপাতালে এসেছি।আলম হোসেন নামের আরেক রোগি জানান, কয়েক বছর থেকে চোখের সমস্যায় ভুগছি! এর আগে নাটোরে চিকিৎসা নিয়েছি ভালো ফলাফল পায়নি।দুই মাস থেকে রামেক হাসপাতালে সেবা নেয়ার পরে চিকিৎসক চশমা ব্যবহার ও নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি।চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, চোখের সমসার মাঝে সবচেয়ে বেশি চোখের ছানি, গ্লুকোমা, নেফ্রনালি চোখের প্রেসার, রিপিয়ার, বাঁকা চোখ সোজা করা, চোখের পাতার অপারেশন, টিউমার, পাথর প্রতিস্থাপন, মাসুরা অপারেশন, লেজার চিকিৎসা।যারা চোখে কম দেখেন তাদের চোখ পরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে চশমা নেয়া উচিত।চিকিৎসাবিদরা বলছেন, চক্ষুরোগির বেশিরভাগই বর্তমানের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের শিকার।কারণ, বিনোদনের অভাব থাকায় ইন্টারনেট, ফেসবুক বা ভিডিও গেমে দীর্ঘ সময় দৃষ্টি রাখছে।এমন অসচেতনতা, ঘরমুখি জীবন ব্যবস্থা এবং পড়াশোনাসহ নানা মানসিক চাপে থাকার কারণেও চোখের সমস্যা বাড়ছে।এছাড়াও জন্মগত চোখ বাঁকা, আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে, গর্ভবতী মায়ের ভগ্নস্বাস্থ্য এবং অপরিণত বয়সে সন্তান প্রসব, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ক্ষীণদৃষ্টি সমস্যায় আক্রান্ত হয়।জন্মের সময় অনেক প্রিম্যাচিউর বেবির ক্ষেত্রে ফুসফুসের সমস্যা দেখা দেয়।আর ফুসফুসের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাচ্চার চোখের ক্ষতি হয়।প্রতিদিন অনেক শিশু চোখের সমস্যা নিয়ে আসেন।

এদের মধ্যে শতকরা ২৫ থেকে ৩০ জনেরই অপারেশন লাগে।জানা যায়, সাধারণত বয়স বাড়া, ডায়াবেটিস রোগ, অনিয়ন্ত্রিত স্টেরয়েড ব্যবহারে চোখের সমস্যা হতে পারে।রাজশাহী হাসপাতাল বাদে পার্শ্ববর্তী জেলার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চক্ষু বিভাগ থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত জনবল, উন্নত যন্ত্রপাতি, বাজেট ও অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।অনেক চিকিৎসকের মাইক্রো সার্জারি প্রশিক্ষণ নেই বলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগিরা যথাযথ এবং মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।আবার প্রাইভেট মেডিকেলে চিকিৎসা ব্যয় বেশি বলে অনেকেই সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখছেন না।রামেক হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. ইউসুফ আলী জানান, অতিরিক্ত সময় ধরে মেসেজ বা বার্তা টাইপ করা হলে আঙুলের জয়েন্টগুলোতে ব্যথা হতে পারে এবং অবস্থা বেশি খারাপ হলে আর্থরাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অনেকের ঘাড় ব্যথার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।বসার ভঙ্গির কারণেও শরীরে নানা অসুবিধা দেখা দিতে পারে।অতিরিক্ত সময় ধরে মুঠোফোনে বার্তা লিখা যাবে না বা অতিরিক্ত সময় স্মার্টফোনের স্ক্রিনে তাকানো যাবে না।তিনি আরও বলেন, ৪০ উর্ধ্ব ব্যক্তিরা বেশি সমস্যায় ভুগছেন।প্রায় ৩০ শতাংশ ছোট বাচ্চা এখন দূরে দেখতে পাচ্ছে না। হাসপাতালে বেশির ভাগ রোগির ছাঁনির অপারেশন করা হচ্ছে।তিনি বলেন, জনবল সংকট থাকলেও আমরা আউটডোর ও ইনডোরসহ জেলা ও থানার কমিউনিটি ভিশন সেন্টারে চার শতাধিকের বেশি রোগিকে সেবা দিচ্ছি।হাসপাতালে সরকারিভাবে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে অতি স্বল্পমূল্যে।একটি পরীক্ষা বাইরে করাতে যেখানে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয় সেখানে হাসপাতালে মাত্র এক হাজার টাকায় হচ্ছে।চোখের সমস্যা থাকলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

IPCS News /রির্পোট, আবুল কালাম আজাদ।