বুধবার ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

রামেকের হিসাবরক্ষক পদটি আলাদীনের চেরাগ ঘষা দিয়েই শত কোটি টাকার মালিক

আপডেটঃ ৮:৪২ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ০৫, ২০২০

নিউজ ডেস্কঃ

তাঁর বাড়ি বরিশাল তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহীতে চাকরি করছেন।কখনো থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আবার কখনো সিভিল সার্জন অফিসে।সর্বশেষ তিনি এখন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রধান হিসাবরক্ষক।এর আগে তিনি রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিসের হিসাবরক্ষক ছিলেন।সেখান থেকে বছর দেড়েক আগে বদলি হয়ে গেছেন রামেক হাসপাতালের প্রধান হিসাবরক্ষক হিসেবে।এরপর থেকে তিনি হাসপাতালের সমস্ত উন্নয়নকাজ থেকে শুরু করে কেনাকাটার নিয়ন্ত্রক হয়ে যান তিনি।সকল বিল-ভাউচারও পাশ হয় তাঁর হাত দিয়ে।আর এসব করতে গিয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতের ৪০ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে একজন হয়ে উঠেন তিনি।তিনি হলেন আনোয়ার হোসেন।এই আনোয়ার হলেন সাবেক প্রধান হিসাবরক্ষক মহিউদ্দিন মারুফের ডানহাত বলে পরিচিত।দুর্নীতিবাজ মহিউদ্দিন মারুফ স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া পরে আরেক দুর্নীতিবাজ আনোয়ারর হোসেনকে।একজন সাবেক আরেকজন বর্তমান।দুইজনই হিসাবরক্ষক রামেক হাসপাতালের।

রামেকের হিসাবরক্ষক পদটি যেন,আলাদিনের চেরাগ ঘষা দিয়েই শত কোটি টাকার মালিক।হিসাবরক্ষক থেকে ভক্ষক হয়ে ওঠা আনোয়ার-মহিউদ্দিনের সম্পদের বিবরনী চেয়ে দুদক থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে গত কয়েকদিন আগে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা কর্মচারী-কর্মকর্তারা এখন আলোচনার কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।তাদের সম্পদেরর খোঁজ নিতে এরই মধ্যে মাঠে নেমেছে দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থা।তাদের মধ্যে রয়েছেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রধান হিসাবরক্ষক আনোয়ার হোসেন।এই আনোয়ার হোসেন এক সময় রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিসের হিসাব রক্ষক ছিলেন।সেখানে টেন্ডার বাণিজ্যের অন্যতম হোতা ছিলেন তিনি।সিভিল সার্জনের দপ্তরের মাধ্যমে ওষুধসহ বিভিন্ন মালামাল কেনাকাটার নামে সরকারি অর্থ হরিলুটেরও হোতা ছিলেন তিনি।

সম্প্রতি সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে তিনি রামেক হাসপাতালে যোগ দেন।অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই আনোয়ারের সঙ্গে আঁতাত করে রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিসের মাধ্যমে কেনাকাটা করা সরকারি ওষুধ বাইরে বিক্রি করেও বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।পাশাপাশি তিনি ওষুধ কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কেনানাকাটার টেন্ডার বানিজ্য ও বদলি বাণিজ্যেরও হোতা ছিলেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের।২০১৮ সালের ২২ জুলাই রাজশাহীর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্টোর থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা মূল্যের এক ট্রাক সরকারি ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী পাচারের সময় গোদাগাড়ী উপজেলা হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছিলো র‌্যাব।নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।ওই ঘটনার পরে রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিসের স্টোর কর্মকর্তা মকবুল হোসেন পলাতক রয়েছেন।কিন্তু এই ওষুধ পাচারের নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন হিসাবরক্ষক আনোয়ার হোসেন।তবে পরবর্তিতে পুলিশি তদন্তে আনোয়ার অর্থের বিনিময়ে সে যাত্রায় রক্ষা পান বলে অভিযোগ রয়েছে।ওই ঘটনা ছাড়াও রাজশাহী সিভিল সার্জনের স্টোর থেকে আনোয়ারের সময়কালে একাধিকবার ওষুধ পাচারের সময় বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ ওষুধ জব্দ করা হয়।কিন্তু বরাবরের মতোই ধরা-ছোয়ার বাইরে ছিলেন মূল হোতারা।তবে আনোয়ার হোসেন সিভিল সার্জন অফিস থেকে রামেক হাসপাতালে যাওয়ার পরে ওষুধ পাচার প্রায় জিনো টলারেন্সে এসে গেছে বলে দাবি করেছে ওই কার্যালয়ে একাধিক সূত্র।

এদিকে রামেক হাসপাতাল সূত্র মতে, এই আনোয়ার হোসেন রামেক হাসপাতালে যোগদানের পর থেকে এখানেও টেন্ডার এবং কেনাকাটা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সকল বিষয়টি তাঁর কব্জায় চলে আসে।সাবেক হিসাবরক্ষব মহিউদ্দিন মারুফ তাঁর শীষ্য আনোয়ার হোসেনকে সমস্ত গোপন ফাইলপত্রসহ সকল অনিয়মের খাতগুলোও বুঝিয়ে দিয়ে যান।যেগুলো এর আগে অন্য কোনো অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারী খোঁজ পাননি।ফলে আনোয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যে রামেক হাসপাতালের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন।এমনকি সম্প্রতি রামেক হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরে এরই মধ্যে নিয়োগ বাণিজ্যেরও নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন তিনি।

স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালকের গাড়ীর ড্রাইভার আব্দুল মালেক গ্রেপ্তার হওয়ার পরে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনায় উঠে আসে এই আনোয়ারও।কয়েকদিন আগে এই আনোয়ারসহ সাবেক হিসাবরক্ষক মহিউদ্দিন মারুফের সম্পদের হিসেবে চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক।নগরীর বহরমপুর এলাকায় আনোয়ার হোসেনের ৫ তলা একটি বাড়ি রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র।এর বাইরে নিজের এবং স্ত্রী-সন্তানের নামে-বেনামে করেছেন অগাধ সম্পদ।দুদকের চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।তবে আমি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নয়। তার পরেও আমার সম্পদ বিবরণী দ্রুত আমি দুদককে দিব।তবে আমার কোনো অবৈধ সম্পদ নাই।’

এদিকে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, রামেক হাসপাতালের আরেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ছিলেন মহিউদ্দিন মারুফ।তিনিও হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে বছর দেড়েক আকে স্বেচচ্ছায় অবসরে যান তিনি।মহিউদ্দিন মারুফের রয়েছে নগরীর বহরমপুরে স্ত্রীর নামে একটি তিন তলা বাড়ি। যায়গা কিনে সেখানে বাড়িটি নির্মাণ করেন তিনি।অভিযোগ রয়েছে, মহিউদ্দিন মারুফ প্রায় ১০ বছর ধরে রামেক হাসপাতালজুড়ে নানা অপকর্মের হোতা ছিলেন।টেন্ডার বাণিজ্য, মজুরিভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ, স্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ, বদলি, কেনাকাটা থেকে শুরু করে নানা বাণিজ্যের হোতা ছিলেন তিনি।নিজের স্ত্রী নার্গিস আরা রুবিকে ক্ষমতার জোরে রামেক হাসপাতালের অফিস সহকারী পদ থেকে হাসপাতালের সমাজসেবা কর্মকর্তা পদে বসে রেখেছিলেন বছরের পর বছর ধরে।এ নিয়ে দৈনিক কালের কণ্ঠে একটি অনুসন্ধানী খবরও প্রকাশ হয়েছিলো।

তবে নানা অনিয়মের হোতা মহিউদ্দিন মারুফ শেষ পর্যন্ত তাঁর অপকর্ম ঢাঁকতে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসরে যান।অবসরে যাওয়ার পরে তিনি আবারও চাকরি ফিরে পেতে উচ্চ আদালতে মামলা করেন।তবে তাতেও তিনি আর চাকরিতে ফিরে আসতে পারেননি।অভিযোগ রয়েছে, কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়ায় এই মারুফ রামেক হাসপাতালে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন।সেই থেকে এই মারুফ এখন অন্তত শত কোটি টাকার মালিক।তবে অনিয়ম-দুর্নীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মহিউদ্দিন মারুফ বলেন, আমি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।আমার নামে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।স্বামী-স্ত্রীর চাকরির টাকায় একটি বাড়ি ছাড়া অন্য কোনো সম্পদও নাই আমাাদের।

IPCS News /রির্পোট, আবুল কালাম আজাদ।