মঙ্গলবার ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ ইং ১১ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে খেয়াঘাট গুলিতে জিম্মি চরের মানুষ

আপডেটঃ ৫:৫৪ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

নিউজ ডেস্কঃ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভারত সীমান্ত ঘেষা পদ্মার শতাধিক বিচ্ছিন্ন চরভুমিতে কয়েক যুগ ধরে বসবাস করেন লক্ষাধিক মানুষ।মূলভুখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এসব চরবাসীর পেশা কৃষিনিত্য প্রয়োজনে বিস্তীর্ণ পদ্মা পাড়ি দিয়ে জেলা বা উপজেলা সদরে যাতায়াতের একমাত্র বাহন নৌকা।পদ্মার বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে ৮টি ফেরিঘাট।ফেরিঘাটগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক মাফিয়াচক্র।অথচ এসসব ঘাটের কোন সরকারি ইজারা নেই।প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই তারা ভয়ানক এই নৈরাজ্য চালাচ্ছে।ভুক্তভোগী চরাঞ্চলবাসীর অভিযোগে বলা হয়েছে, চাষাবাদের কাজে ব্যবহৃত একটি পাওয়ার টিলার পারাপারে জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে সাড়ে ৬ হাজার টাকা।একটি সেলাই মেশিন পার করতে মাফিয়াচক্রকে দিতে হয় ৪৫০ টাকা। ৫ থেকে ২০ কেজির খাদ্য পণ্য পারাপারে দিতে হচ্ছে ২৫০ টাকা।এক আঁটি আউড় বা গোখাদ্য পারাপারে দিতে হয় ১০০ টাকা।আর তিন বছরের একজন শিশুর ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ৫০ টাকা।এ ভয়ানক নৈরাজ্য আর অরাজকতা চলছে বছরব্যাপী।

শত শত ভুক্তভোগী চরবাসী একাধিকবার জেলা প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলেও ঘাট মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।চরবাসী ঘাট মাফিয়াদের কাছে পুরোপুরি জিম্মি জীবন কাটাচ্ছেন।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলা এলাকায় পদ্মায় রয়েছে ৮টি সরকারি ফেরিঘাট।ব্যাপক মাদক ও ভারতীয় গরু চোরাচালানের কারণে ঘাটগুলোর গত কয়েক বছরের ইজারা মূল্য ছিল কোটি কোটি টাকা।কিন্তু বর্তমানে গরু চোরাচালান বন্ধ হওয়ায় চলতি বছরে ঘাটগুলোর কোন ইজারা হয়নি।অভিযোগ রয়েছে, কোন ইজারা ছাড়াই মৌখিকভাবে ঘাটগুলো তুলে দেয়া হয়েছে মাফিয়া চক্রের হাতে।ঘাটে ঘাটে সশস্ত্র ক্যাডার বসিয়ে চক্রের হোতারা চরবাসীকে জিম্মি করে আদায় করছে লাখ লাখ টাকা।অথচ এসব টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিবগঞ্জ উপজেলার কদমতলা চরের চাষি রুহুল আলী গত ৯ ফেব্রুয়ারি পাঁকা ইউপি এলাকার পদ্মার পাঁকা, উজিরপুর-রাধাকান্তপুর, লক্ষীপুর, হাসানপুর, নিউ পদ্মা ও পাঁকা বিল ফেরিঘাটে সরকারি টোলহারের অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১০০ গুণ বেশি হারে টাকা আদায়ের ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ তুলে ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত আবেদন করেন।

জেলা প্রশাসক বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) নির্দেশ দেন। শিবগঞ্জের ইউএনও, এসি ল্যাণ্ডকে তদন্তের নির্দেশ দেন।এসি ল্যাণ্ড শিবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়ন ভূমি অফিসারকে অভিযোগ সরজেমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন।ভুক্তভোগী রুহুল আলির অভিযোগ ফেব্রুয়ারি মাসের অভিযোগ তদন্ত করতে প্রশাসন ৬ মাস পার করে।গত জুনে তদন্ত শেষে এসি-ল্যাণ্ড শিবগঞ্জ ফেরিঘাটগুলিতে মাফিয়া চক্রের চলা ভয়ানক নৈরাজ্যের সরজেমিন প্রতিবেদন দাখিল করেন ইউএনও বরাবর।গত ১ জুলাই ইউএনও শিমুল আক্তার চিঠি দিয়ে ঘাটগুলোর প্রবেশপথের দুই পাশে সরকারি টোলচার্ট লাগানোর নির্দেশ দেন।তবে রহস্যজনক কারণে ঘাটগুলোতে টোলচার্ট টানানো হয়নি গত দুই মাসেও।ফলে ঘাট মাফিয়ারা এখনও চরবাসীকে জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।অভিযোগ করার তাদের আর কোন জায়গাও নেই।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘাট মাফিয়াচক্রের মুলহোতাদের অন্যতম বিএনপি নেতা জামাল মেম্বার ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশের তালিকায় থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী উজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দিন (হাতকাটা ফয়েজ)।এই দুই মাফিয়া সিণ্ডিকেট যৌথভাবে পদ্মার উজানের হাসানপুর থেকে ভাটিতে ঘোড়াপাখিয়া পর্যন্ত বিস্তীণ এলাকার সবগুলি ঘাট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মাফিয়ারাজ কায়েম করেছে।চরাঞ্চলের অসহায় ও নিরীহ মানুষদের কাছ থেকে টোলের নামে বিপুল চাঁদা আদায় নিশ্চিত করতে একেকঘাটে ১০ থেকে ১৫ জন করে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী মোতায়েন করা হয়েছে।

এ ছাড়া কোন প্রকার ইজারা ছাড়াই ফয়েজ ও জামাল মেম্বার সিন্ডিকেটকে ঘাটগুলোর টোল আদায়ের দায়িত্বে বসিয়েছেন ইউএনও শিবগঞ্জ।খাস কালেকশানের নামে চাঁদাবাজি করতে মাফিয়াচক্রকে ঘাটগুলোতে কেন এবং কার স্বার্থে বসানো হয়েছে সেই প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের মাঝে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

এই বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাকিব আল রাব্বি বলেন, পদ্মার ফেরিঘাটগুলোতে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।তিনি স্বীকার করেন, ফেরিঘাটগুলোর তিনটির ইজারা নেই।ইউনিয়ন ভূমি অফিসারকে খাস কালেকশান করতে বলা হয়েছে।টোলচার্ট কেন এখনো ঘাটে দেওয়া হয়নি সেই প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, চলতি মাসের শেষের দিকে জেলায় এই সংক্রান্ত সভা হবে।সেখানে টোলচার্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।পাঁকা ইউনিয়ন ভুমি কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম বলেন, জামাল মেম্বার বা ফয়েজ চেয়ারম্যানকে আমি টোল কালেকশানের দায়িত্ব দেয়নি।ইউএনও সাহেবের মৌখিক নির্দেশে তারা ঘাটে টাকা তুলছেন।খাস কালেকশান সরকারি কোষাগারে জমা হয়।

IPCS News /রির্পোট, আবুল কালাম আজাদ।