শনিবার ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

তামাক নিয়ন্ত্রন আইন উপেক্ষিত

আপডেটঃ ৩:০৬ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ১২, ২০২০

নিউজ ডেস্কঃ

রাজশাহী শিরোইল, ঢাকা বাসকাউন্টার রাজশাহীর সামনে বসে ধূমপান করছে একদল কিশোর ও অপেক্ষামান যাত্রীরা।পাশেই দাঁড়িয়ে নাক চেপে দোকান থেকে খাবার কিনছেন মাসুদা আক্তার পপি নামের এক মহিলা।কষ্ট হলেও তিনি সিগারেটের ধোয়ার গন্ধ সহ্য করে কিনে নিয়ে যান তার খাবার।মাসুদা আক্তার পপি জানান, একদিন তিনি স্কুল থেকে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি যাবার সময় তার ছেলে পাশের দোকান  সিগারেট দেখে জানতে চায় এটা কী? তিনি বলেন, এটি বাজে জিনিস।তারপরও ছেলেকে বুঝাতে হয় এটি কেউ খেলে তার সামনে দিয়ে হেঁটে যাবার সময় যাতে নাক ধরে যায়।তিনি আরও বলেন, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় অধিকাংশ সময়ই নাক চেপে হাঁটেন।কারণ রাজশাহীতে ইদানিং প্রকাশ্য ধূমপান বেড়ে গেছে।তাঁর সামনের পথচারী হাঁটতে হাঁটতে ধূমপান করেন।পেছনের পথচারীদের মুখে সে ধোঁয়ার ঝাপটা লাগছে।খারাপ লাগলেও কেউ কিছু বলছেন না।ফুটপাতে হাঁটার সময় বা রাস্তায় বাসের জন্য দাঁড়ালে অনেক সময় সিগারেটের ধোঁয়া খেতে হয়! ক্ষতি হলেও করার কিছু থাকে না।’শুধু স্টেশনেই নয় সম্প্রতি রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় এখন চোখে পড়বে প্রকাশ্য ধূমপান।উন্মুক্ত স্থানে ধূমপানের আধিক্য চোখে পড়েছে।ফুটপাতে, পার্কে, মার্কেটে,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে যেখানে জনসমাগম সেখানেই দেখা গেছে কেউ না কেউ ধূমপান করছে।অনেক সময় ফুটপাতে হাঁটার সময় ধূমপায়ীর হাতে থাকা সিগারেটের আগুন অন্য পথচারীদের হাতে, গায়ে লাগছে।চোখ শক্ত করে একবার তাকানো ছাড়া আর কিছু করার থাকে না বলে জানালেন একাধিক ভুক্তভোগী।

এত সব আইন ও ধারা থাকলেও সেই আইনের প্রয়োগ নেই।এমনকি কোথাও কোথাও আইন প্রয়োগকারী সদস্যরাও ভঙ্গ করছে এই আইন।স্কুলের পাশেই গড়ে উঠেছে সিগারেটের দোকান।ফলে অল্প বয়সেই এটার প্রতি আসক্ত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরাও।অথচ একযুগ আগেরই এটি নিয়ন্ত্রণে আইন করা হয়েছে।আইন অনুযায়ী, জনপরিসরে বা উন্মুক্তস্থানে ধূমপান নিষিদ্ধ। কেউ এমন স্থানে ধূমপান করলে অনধিক ৩০০ টাকা জরিমানা করার বিধান আছে।একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে তিনি দ্বিগুণ হারে দন্ডিত হবেন।ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০০৫ (সংশোধিত আইন-২০১৩) এর ধারা-৪ (১) উল্লেখ আছে, পাবলিক প্লেসে এবং পাবলিক পরিবহণে কোনো ব্যক্তি ধূমপান করতে পারবে না।কোন ব্যক্তি যদি এই ধারার বিধান লঙ্ঘন করে তাহলে তিনি অনধিক ৩০০ (তিনশত) টাকা অর্থদন্ডে দন্ডনীয় হবেন এবং উক্ত ব্যক্তি দ্বিতীয়বার একই ধরনের অপরাধ সংঘটন করলে তিনি পর্যায়ক্রমিকভাবে উক্ত দন্ডের দ্বিগুণ হারে দন্ডনীয় হবেন।

এছাড়াও তামাক নিয়্ন্ত্রণ আইনের ৭ (ক) ধারায় উল্লেখ আছে, তামাক নিয়্ন্ত্রণ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, প্রত্যেক পাবলিক প্লেস বা পাবলিক পরিবহনের মালিক, তত্তাবধায়ক, নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি, বা ব্যবস্থাপক বিধি দ্বারা নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করবেন।এই ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি অনধিক ৫০০ (পাঁচশত) অর্থদন্ডে দন্ডনীয় হবেন।আইনে সিগারেটের দোকান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে ২০ গজ দূরে থাকতে হবে বলে বলা হয়েছে।সম্প্রতি এই আইন না মানার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫এর ২(চ) ধারা অনুসারে পাবলিক প্লেস বলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস; গ্রন্থাগার, লিফট, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, আদালত, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, নৌবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপণিবিতান, রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক, মেলা বা পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সারি, জনসাধারণের সম্মিলিত ব্যবহারের স্থান বোঝায়।এদিকে, অন্তত ৫০ জন পথচারী নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা ধূমপান নিয়ন্ত্রণে আইন আছে শুনেছেন, কিন্তু প্রয়োগ হতে দেখেননি।তাঁরা বলেন, ধূমপায়ীরা স্থান-কাল মানেন না।অনেক সময় হাতে সিগারেট লেগে পুড়ে যায়।শহরের যেখানে সেখানে লোকসমাগমের জায়গায় সিগারেটের দোকান, ভ্রাম্যমাণ দোকানে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য পাওয়া যায়।তাঁরা মনে করেন, মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়ে গেছে বলে ধূমপানের হার বাড়ছে।তবে রাজশাহীর অনেক দোকানী ও ধূমপায়ী জানেইনা এই আইন সম্পর্কে।তাদের দাবি আইন আছে এমন কোন তথ্য তারা জানেন না।রাজশাহী সাহেব বাজার বড় মসজিদের পিছলে সিগারেট বিক্রি করেন সঞ্জয় কুমার।তিনি বলেন, এ রকম কোন আইন সম্পর্কে তিনি জানেন না।আবার এ ধরণের কোন জরিমানার কথাও তিনি শুনেন নি।আর থাকলেও বা কি হবে কেউ মানবে না।এই আইনের তো প্রয়োগই নেই।তাই সবাই প্রকাশ্য বিক্রি করে খাবার ব্যবস্থা রাথে আমিও রেখেছি।রাজশাহী সাহেব বাজারে ধুমপান করতে করতে যাচ্ছেন মো হাকিম।

তিনি বলেন, আমি এই আইনের নামই শোনিনি।এটি আবার কথা হলো।সিগারেট খেলে জরিমানা হয় জানেন না তিনি।তবে হলে ভালোই হবে বলে জানান তিনি।এবিষয়ে এ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডির তামাক নিয়্ন্ত্রণ প্রকল্পের এডভোকেসি অফিসার শরিফুল ইসলাম শামীম বলেন, আমাদের প্রজেক্ট চলাকালে আমরা এডিএম স্যারের নেতৃত্বে কিছু অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেছি।সেই সময় সচেতনও হয়েছে অনেকেই।তবে সাম্প্রতিক সময়ে আর নিয়ন্ত্রনে নেই। এ সুযোগে তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন বিজ্ঞাপনও দিচ্ছে।মানুষ পাবলিক প্লেসে এই আইনটি মানছেন না।তিনি বলেন, আইনের প্রয়োগের অভাবে আবার নতুন করে এগুলো বাড়ছে।এজন্য আমরা কর্তৃপক্ষের নিকট আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে বলেছি।এবিষয়ে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু আসলাম বলেন, আমাদের মোবাইল কোর্ট প্রায়ই জরিমানা করে।মোবাইল কোর্ট অনেককেই জরিমানা করেছে।জেলা পর্যায়ে ধূমপানের বিষয়ে যে টাস্কফোর্স আছে তার ফোকাল পারসন জেলা সিভিল সার্জন, ডা. এনামুল হক বলেন, এটা একদিনে নিয়েন্ত্রণে আসবে না।প্রচার প্রচারনার মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে।এখন আমরা চাষও করবো, বিপননও করবো, আবার নিয়ন্ত্রণও করবো এটা খুবই দুরহ ব্যাপার।এটি আজ হোক বা কাল হোক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।যেমন আমরা গাঁজা চাষ নিয়ন্ত্রণে এনেছি তেমন তামাকের চাষও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।সচেতনতা বাড়াতে হবে, দামও বাড়তে হবে।তবে দাম বাড়ালেই যে নিয়ন্ত্রণে আসবে সেটি আমার কাছে মনে হয় না।তাদের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময় সভা সমাবেশে প্রচার প্রচারনা চালানো হয় বলে জানান সিভিল সার্জন।

IPCS News /রির্পোট, আবুল কালাম আজাদ।