বৃহস্পতিবার ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সংবাদ শিরোনামঃ

বিমান ছিনতাইয়ে শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা

আপডেটঃ ১২:০৮ অপরাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯

ছবি-সংগৃহীত

ঢাকা থেকে ফ্লাইটটি টেকঅফের ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় ১৫ হাজার ফুট উপরে ওঠে যায়।

বিজনেস ক্লাসে বসা ৯ যাত্রী। আন্তজার্তিক যাত্রী ছিলেন ৫৮ জন। অভ্যন্তরীণ যাত্রী ছিলেন ৭৫ জন। ৫ জন বিদেশি যাত্রীও ছিলেন। ফ্লাইটের ককপিটে ছিলেন ক্যাপ্টেন শফিউল ও ফার্স্ট অফিসার মুনতাসির। কেবিন ক্রু ছিলেন- নিম্মি. হুসনে আরা, সাগর, সাকুর ও বিথী।

আলোচিত যাত্রী পলাশ আহমেদ ওরফে মাহদী নামে বসা ছিল ইকনোমি ক্লাসের ১৭-এ নং আসনে। একজন কেবিন ক্রু দেখতে পান হঠাৎ মাহদী নিজের আসন ছেড়ে বিজনেস ক্লাসের একটি সিটে বসে নিজের সঙ্গে থাকা হ্যান্ডব্যাগে পিস্তল ও বোমা আছে বলে চিৎকার করতে থাকেন। এ সময় তিনি ককপিটের দরজা খুলে পাইলটের সঙ্গে কথা বলার বায়না ধরেন।

যদি কথা বলতে না দেয়া হয় তাহলে ফ্লাইট বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেন। এ পর্যায়ে কেবিন ক্রুদের একজন তার আড়ালে গিয়ে ককপিটে থাকা পাইলটকে জরুরি কোডে সংকেত পাঠান। এ সময় পাইলট তাকে অত্যন্ত সুকৌশলে ঠাণ্ডা মাথায় মাহদীর কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন।

কেবিন ক্রুরা সেভাবেই হ্যান্ডেল করছিলেন তাকে। এর মধ্যে মাহদী একবার ককপিটের দরজার কাছে গিয়ে পটকা জাতীয় কিছু ফোটান। তাতে বিকট শব্দ হলে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ সময় কেবিন ক্রুরা তাকে ঘিরে তার সমস্যা জানার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়।

উল্লেখ্য, রোববার বিকালে দুবাইয়ের উদ্দেশে ক্রুসহ ১৪৮ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজ উড্ডয়ন করে। উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে বিমানটি।

বিমানের চট্টগ্রামগামী ফ্লাইটটি যখন মাঝ আকাশে, তখন এক ব্যক্তি পাইলটকে অস্ত্র ঠেকিয়ে উড়োজাহাজটি জিম্মি করেন। অবস্থা বেগতিক দেখে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানের জরুরি অবতরণ করা হয়। জরুরি অবতরণের পরপরই রানওয়েতে বিমানটি ঘিরে ফেলে সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশ।

পরে সব যাত্রীকে নিরাপদে নামিয়ে আনা হলেও একজন ক্রুকে ওই ছিনতাইকারী জিম্মি করে রাখে বলে সূত্রের খবর।

পরে বিমানবন্দরে যায় সোয়াত টিম ও বোম ডিসপোজাল ইউনিট। ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসও।

ঘটনাস্থল থেকে একাধিক সূত্র জানায়, বিমানের বিজি-১৪৭ নম্বর ফ্লাইটটি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা হয়ে দুবাই যাওয়ার কথা। কিন্তু উড্ডয়নের পরপরই এ ঘটনা ঘটে।

এরপরই দ্রুত ফ্লাইটের সব যাত্রীকে নামিয়ে দেয়া হয়। বিমানটি রানওয়েতে অবস্থান করে এবং সেটি ঘিরে ফেলেন সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

বিমানবন্দরের একাধিক সূত্র জানায়, যাত্রীদের নামিয়ে আনলেও সাগর নামে একজন ক্রু ও ছিনতাইকারী বিমানটির ভেতরে রয়ে যান।

বিমানটি রোববার বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে জরুরি অবতরণ করা হয়। তাৎক্ষণিক সেখানে বিমান ওঠানামা বন্ধ করা হয় বলে জানান বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্লাহ।

পরে সেনা স্পেশাল ফোর্স ও নৌ কমোডর এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমানের নেতৃত্বে নৌ কমোডর দলের অভিযানে সন্দেহভাজন ওই ছিনতাইকারীকে আহতাবস্থায় আটক করা হয় এবং আহতাবস্থায় ক্রু সাগরকে উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বিমানটির সব যাত্রী-ক্রুরা সুস্থ রয়েছেন। বিমানের কোনো ক্ষতিও হয়নি।

এদিকে রোববার রাত পৌনে ৯টার দিকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিমানের ভেতরে অভিযান চালানোর সময় ওই ব্যক্তিকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয় কিন্তু সে অস্বীকৃতি জানালে গুলি চালানো হয়। পরে তার মৃত্যু হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বিমানে ক্রুসহ ১৪৮ জন যাত্রী ছিলেন। তারা সবাই নিরাপদে বের হয়ে এসেছেন।

এর আগে রাত ৮টার দিকে সিভিল অ্যাভিয়েশনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৭টা ১৭ মিনিটে অভিযান পরিচালনা করে। এটি শেষ হয় ৭টা ২৫ মিনিটে। এ সময় ছিনতাইকারীকে আহত অবস্থায় আটক করা হয়।

রোববার রাতে নিহত ওই যুবকের পরিচয় নিয়ে একাধিক তথ্য জানানো হয়, যা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়। প্রথমে বলা হয়, তার নাম মাহাদী। পরে বলা হয় মো. মাজিদুল। তবে টিকিটে তার নাম মো. মাজিদুল লেখা ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়। কিন্তু সোমবার যে তথ্য এল, তাতে দেখা যাচ্ছে তার নাম মাহাদী ও মাজিদুল কোনোটিই নয়; তার নাম মো. পলাশ আহমেদ।

 ছিনতাইকারী পলাশ বুঝতে পারেন ভিতরে অভিযান হয়তো হবে। তখন তিনি বাঁচতে শেষ চেষ্টা করেন। আর তার চেষ্টার ঘুঁটি হিসেবে রাখেন সাগরকে। তিনি সাগরের পোশাক খুলে দিতে বলে। সাগর তখন তাই করে। পলাশ কেবিন ক্রুর পোশাক পরে নিজেকে সোনা কমান্ডোর টার্গেট থেকে আড়াল করতে চেয়েছিল। এ বিষয়টি বুঝতে পেরেছিল সাগর নিজেও। তিনি হয়তো টার্গেটে পড়ে যাবেন। সাগর তার পোশাক খুলে পলাশের হাতে তুলে দেন। পলাশ সেই পোশাক নিয়ে যখন পরতে শুরু করেন, ওই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দৌড়ে উড়োজাহাজ থেকে বেরিয়ে যান সাগর। নতুন জীবন ফিরে পান সাগর। তার বুদ্ধিমত্তায় যেমন উড়োজাহাজ রক্ষা পায় তেমনি জীবন বাঁচে ১৪৭ জন যাত্রীর।